February 28, 2025
ফিচার ১কলাম

আমার চোখে নারীর ক্ষমতায়ন

আন্দালীব মাহেজাবীন।। আমি একজন কর্মজীবী নারী। নারী ক্ষমতায়নের সবকটি সূচকই আপাতদৃষ্টিতে আমার মাঝে বিদ্যমান আছে বলে মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে তা আদৌ আছে কি?

নারী ক্ষমতায়ন এমন একটি বিষয় যা পুরো বিশ্বে প্রায় একই সূচকে বিবেচিত হয়ে আসলেও আমার দৃষ্টিতে নারী ক্ষমতায়নের বিষয়টিকে একই সুতোয় একটি সরলরেখায় বিবেচনা করা সম্ভব নয়। নারী ক্ষমতায়ন সমাজ ও দেশভেদে যেমন ভিন্ন হতে পারে তেমনি একই সমাজের ভিন্ন ভিন্ন আর্থ-সামাজিক স্তরে অবস্থান করা নারীর জীবনে ক্ষমতায়নের সূচকও ভিন্ন হতে পারে বলে আমি মনে করি। যদিও কিছু বিষয় সব সমাজে সকল পর্যায়ের নারীর ক্ষেত্রে সমানভাবে ক্ষমতায়নের সূচক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

আমার জানামতে বাংলাদেশের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে নারীদের সংখ্যা পুরুষের তুলনায় অনেক কম। ফলশ্রুতিতে কর্মক্ষেত্রে যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে পুরুষের প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। এই সিদ্ধান্ত যদি নারীবান্ধব নাও হয় , তবুও সেখানে ঐ বিষয়টি নিয়ে কথা বলার জন্য কোন নারীকণ্ঠ থাকে না। আবার দেখা যায়, তথাকথিত শিক্ষিত- সচেতন পুরুষ সহকর্মীরাও এ বিষয়ে হয় উদাসীন থেকে যান, নয়তো কিছু বলার প্রয়োজনই মনে করেন না। অনেক সময় সিদ্ধান্তটি যে নারীবান্ধব হয়নি তা তারা বুঝতেই পারেন না। তাদের মানসিকতায় একজন পুরুষ যদি পুরুষবান্ধব কর্মপরিবেশ না চায় তাহলে নারীদের জন্য আলাদা করে নারীবান্ধব কর্মপরিবেশ তৈরি করার কী আছে! বিষয়টি যেন তাচ্ছিল্যের হয়ে যায়। এর পাশাপাশি নারীরা যেহেতু নিজেকে পুরুষের সমকক্ষ মনে করছে তাহলে তাকে আলাদা সুবিধা দেওয়ার কী আছে, এমনটাও ভাবা হয়। তাছাড়া নারীও যে পুরুষের চেয়ে অনেক ক্ষেত্রেই ভালো কাজ করতে পারে সে বিষয়টিকেও মানতে চাওয়া হয় না বা অনেক সময় কটাক্ষ করা হয়।

কোনো একটা কাজ, যেটা নারীর জন্য কষ্টসাধ্য হতে পারে, সেটা পুরুষের জন্যেও খুব সহজ কিছু নাও হতে পারে। এমনও তো হতে পারে যে ঐ কাজটা উভয়ের জন্যই কষ্টসাধ্য এবং কাজটা করতে গিয়ে উভয়েরই ভুল হতে পারে বা একটু বেশি সময় প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু দেখা যায়, এরকম ক্ষেত্রে খুব সহজেই একজন নারী কর্মীকে তার নারীত্বের বিষয়টিকে দায়ী করে দোষারোপ করা হয়। সরাসরি বলে ফেলা হয় যে, নারী হওয়ার কারণেই সে এমন ভুল করেছে। অথচ একই ভুল একজন পুরুষ কর্মী করলে এক্ষেত্রে তার অনভিজ্ঞতা বা মনোযোগের অভাবকে দায়ী করা হয়, তার পুরুষ হওয়ার বিষয়টিকে আলাদা করে বিবেচনায় আনা হয়না।

এবার আসা যাক কর্মক্ষেত্রের অবকাঠামোর সাথে সম্পৃক্ত কিছু বিষয়ের প্রসংগে। নারীদের জন্য পৃথক ওয়াশরুমের কথা যদি নাও বলি তাহলেও আরও কিছু বিষয় রয়েছে যা একজন নারীর কর্মজীবনকে প্রতিনিয়ত আরও বেশি চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন করে। এর মধ্যে সবার প্রথমে আসে উপযুক্ত ডে-কেয়ার সেন্টারের কথা। বাংলাদেশের প্রতিটা দপ্তরে ডে-কেয়ার না থাকাটা একজন কর্মজীবী নারীর ক্ষেত্রে কতটা ভোগান্তির সেটা সে নিজেই জানে। যার জন্য সন্তান প্রসবের পরে তার কর্মদক্ষতা কমে যাওয়া এমনকি কাজ ছেড়ে দেওয়ার মত ঘটনার প্রবণতাও বেড়ে যায়। এরফলে সন্তানের জন্মদান একজন নারীর কাছে আনন্দ ও আশীর্বাদের বিষয় না হয়ে কোন কোন সময় বরং উল্টো ভোগান্তির কারণ হয়।

অপরপক্ষে যখন একজন নারীকর্মী উন্নতি করে তখন কর্মদক্ষতা নয় বরং অনেকক্ষেত্রে নোংরাভাবে বসকে খুশি করা হয়েছে বলেই উন্নতি সম্ভব হয়েছে এমন মনে করা হয়। আমার মতে নারীর কাজকে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে তার যোগ্যতাকে বিবেচনা না করে তার শারিরীক বৈশিষ্ট্যকে বিবেচনা করা হচ্ছে এ বিষয়টি যতদিন থাকবে ততোদিন পর্যন্ত নারী ক্ষমতায়ন সম্পূর্ণতা পাবে না।

পুরুষ কর্মীকে কেন আলাদা করে পুরুষবান্ধব পরিবেশের কথা ভাবতে হচ্ছে না? নারীকে কেন নারীবান্ধব পরিবেশের জন্য বারবার উচ্চস্বরে চিৎকার করতে হচ্ছে? কোন বিষয়গুলো নিশ্চিত হলে কর্মপরিবেশ নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই উপযুক্ত হবে তা আরও গভীরভাবে ভেবে দেখার অবকাশ রয়েছে।

এখন আসা যাক যাতায়াতের পথে নারীদের হেনস্তার কথা। পথে চলাচলের ক্ষেত্রে নারীরা নানামূখী অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়ে থাকেন। দেখা যায় যে, যেকোন পাবলিক বাসে যাতায়াতের ক্ষেত্রে একজন নারীকে পুরুষের মতোই ভোগান্তির সম্মুখীন হতে হয়। কিন্তু এর সাথে যোগ হয় প্রচন্ড ভিড়ের আড়ালে লুকিয়ে থাকা কিছু সুযোগসন্ধানী পুরুষের নোংরা স্পর্শ। তাছাড়া কোনো কারণে যদি দিন শেষে রাতের অন্ধকারে চলাচল করতে হয় তাহলে পুরুষের মতোই একজন নারীও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে থাকেন। পাশাপাশি যে বিষয়গুলো একজন নারীকে আরও বেশি অনিরাপদ করে তোলে তা হলো কিছু কুৎসিত মানসিকতার পুরুষের অশ্লীল আচরণ। ফলে নারীকে হারাতে হয় তার সম্ভ্রম। কিন্তু সেখানেও দোষটা দেওয়া হয় নারীটিকেই এবং পরবর্তী জীবনেও ভুক্তভোগী হিসেবে নারীকেই তার জের টানতে হয়।

গৃহস্থলির কাজে নারীদের সম্পৃক্ততা নতুন কিছু নয়। এই কাজের কোন নির্দিষ্ট রূপরেখা বা সময়সীমা বলতে কিছু নেই। সেই সাথে নেই কোন আর্থিক মূল্যায়ন । অর্থাৎ, একজন নারী সারাদিন গৃহস্থলির কাজে যে পরিমাণ সময় ও শ্রম ব্যয় করে তার আর্থিক কোন মূল্য নির্ধারণের কোন সুযোগ নেই, আবার এই কাজের কোন স্বীকৃতি পর্যন্ত দেওয়া হয়না। উপরন্তু তাদের কোন বিশ্রামের সময় বা সুযোগ দেওয়া হয় না। অনেক ক্ষেত্রে তাদের অসুস্থতাকেও অবহেলা করা হয় এবং সহযোগিতাও করা হয় না।

পারিবারিক পরিমণ্ডলে একজন নারীর খাদ্যাভ্যাস থেকে শুরু করে প্রায় প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে নতুন করে ভেবে দেখার সময় হয়েছে। যদিও বিভিন্ন গবেষণাকর্মে পারিবারিক সিদ্ধান্ত বা অর্থ উপার্জনে নারীর সম্পৃক্ততাকেই গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হয়, কিন্তু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আরও অনেক বিষয় রয়েছে যা অনেক সময়ই বিবেচনার বাইরে থেকে যায়। এসব ছোট ছোট বিষয়গুলোর কারণে একজন নারী, সে গৃহিনীই হোক বা কর্মজীবীই হোক, উভয়কেই সমানভাবে ভোগান্তির সম্মুখীন হতে হয়। এরমধ্যে নারীর যে প্রচলিত দায়িত্ব, যেমন- সন্তান লালন পালন, রান্নার কাজ, ঘরবাড়ি পরিস্কার করা, বাড়ির প্রবীণদের ও অসুস্থদের সেবা করা ইত্যাদি কাজ নারীকে সমানভাবে করে যেতে হচ্ছে। এই কাজগুলো সহজীকরণের তেমন কোন উদ্যোগ নেই, বরং এসব দৈনন্দিন কাজে যেকোন ভুল-ত্রুটি কখনও কখনও অমার্জনীয় অপরাধ হিসেবে পরিগণিত হয়।

অন্যদিকে একজন নারীর পুষ্টি চাহিদা থেকে শুরু করে তার বিশ্রাম, বিনোদন এমনকি চিকিৎসার সুযোগও থেকে যাচ্ছে মনোযোগের বাহিরে। এখানেই একজন নারী এখনও থেকে যাচ্ছে দুর্বলতার কবলে। নারীর মানসিক চাহিদা প্রায় প্রত্যেক পর্যায়ে আজও চিন্তার বাইরের বিষয় হিসেবেই থেকে গিয়েছে।

প্রতিটি নারীকেই যে অর্থ উপার্জনের সাথে সম্পৃক্ত হতে হবে বিষয়টি তা নয়, আবার নারী অর্থনৈতিক কাজে সংশ্লিষ্ট হলেই যে সে ক্ষমতার অধিকারী হয়ে গেল বিষয়টি কিন্তু এমনও নয়। এমনও দেখা যায়যে, একজন কর্মজীবী নারী, যে হয়তো তার কর্মক্ষেত্রে উচ্চ পর্যায়ে রয়েছেন এবং আর্থিক দিক থেকেও যথেষ্ট স্বাবলম্বী তার ক্ষেত্রেও যে বিষয়টি চোখের আড়ালে থেকে যায়, সেটি হলো তার উপার্জিত অর্থের উপর তার নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ না থাকা। অনেক সময় সে তার প্রয়োজনেও তার উপার্জিত অর্থ ব্যয় করতে পারে না।

তাই আমার চোখে নারী ক্ষমতায়ন তখনই হবে যখন একজন নারী তার কাজের জন্য কাজের মাধ্যমে মূল্যায়িত হবেন। তার দক্ষতাকে গুরুত্ব দিয়ে তার কাজকে স্বীকৃতি দেওয়া হবে, যখন পথ চলার সময় একজন নারীকে আলাদা করে ভাবতে হবেনা যে, তাকে যদি গুরুতর কোন কাজেও রাতের বেলায় বাহিরে যেতে হয়, তাহলে তার সম্ভ্রম হুমকির সম্মুখীন হবেনা।

নারী ক্ষমতায়ন তখনই পূর্ণতা পাবে যখন ঘরে বসেও নারী অবসাদগ্রস্থ হবে না। তার বিশ্রাম, বিনোদন কিংবা মানসিক সুস্বাস্থ্য যখন পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের কাছেও গুরুত্ব পাবে তখনই নারী ক্ষমতায়নের সুফল সব সমাজের সব পর্যায়ের নারী উপভোগ করতে সক্ষম হবে বলে আমার বলে মনে হয়। একটা ফরাসি প্রবাদ দিয়েই শেষ করা যাক, ‘একটি জাতির অগ্রগতি জানতে তার নারীদের দিকে তাকান।’ এই তাকানো কেবল সংখ্যায় নারীর উপস্থিতিকেই যে নির্দেশ করে তা কিন্তু নয়, বরং মানুষ হিসেবে নারীর সঠিক মূল্যায়নের মাধ্যমে পরিবার ও সমাজে তার মর্যাদার প্রতিষ্ঠাকে নির্দেশ করে।

[ফেমিনিস্ট ফ্যাক্টরে প্রকাশিত কলাম লেখকের নিজস্ব বক্তব্য]

Leave a Reply