March 7, 2026
মুক্তমত

ধর্ষণ বেড়েছে ৬৮ শতাংশ, একাত্তরের বিভীষিকা কি ফিরে এসেছে?

তানজিয়া রহমান ।। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যে ভয়াবহতা নারীদের ওপর চালিয়েছিল – তা ছিল সেই সময়ের সবচেয়ে ভয়াবহ অধ্যায়গুলোর একটি। ঘর থেকে তুলে নিয়ে দিনের পর দিন ধর্ষণ, পশুর মতো নারীদেহ আঁচড়ে দেয়া, দেহে কামড় দিয়ে ছিঁড়ে ফেলা, স্তন কেটে ফেলা, নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে আওয়াজ করলে নৃশংস শাস্তি দেয়া, পালানোর চেষ্টা করলে গুলি করা, অসুস্থ হয়ে গেলে হত্যা করা, গর্ভবতী নারীদের গুলি করে হত্যা, শেষে হত্যা করে বিভিন্ন স্থানে লাশ ফেলে রাখা – এইসব নিপীড়নের দৃশ্য আমরা ইতিহাসের বইয়ে পড়েছি, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বইয়ে পড়েছি, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চিত্রনাট্যে দেখেছি। কিন্তু আজ, স্বাধীনতার ৫o বছরেরও বেশি সময় পর প্রশ্ন উঠছে, আমরা কি আবার সেই ভয়াবহ সময়ের পুনরাবৃত্তি করতে যাচ্ছি? ৭১-এর বিভীষিকা কি ফিরে এসেছে নতুন রূপে।

গত কয়েক মাসে বাংলাদেশে নারী ও শিশুদের উপর যেসব সহিংসতা সংঘটিত হয়েছে, তা যেন ৭১-এর ঘৃণ্য পুনরাবৃত্তি। প্রযুক্তির ব্যবহারে সেই সহিংসতা আরও বিকৃত, আরও নিষ্ঠুর হয়ে উঠেছে। ধর্ষণের পর ভিডিও ধারণ করে ছড়িয়ে দেওয়া, এসিডে ঝলসে পলিথিনে মুড়িয়ে জঙ্গলে ফেলে রাখা, আট বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা – এসব কাহিনি কেবল খবরের শিরোনাম নয় বরং আমাদের সমাজের নৈতিক পতনের জলজ্যান্ত উদাহরণ।

দেশে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা কমছে না, বরং আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে চলেছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রতিবেদন বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ধর্ষণের ঘটনা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে প্রায় ৬৮ দশমিক ৫ শতাংশ। একই সময়ে শিশুর প্রতি সহিংসতার হার বেড়েছে ৩৮ শতাংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রবণতা কেবল পরিসংখ্যানের বিষয় নয়, বরং সামাজিক নিরাপত্তা ও মানবাধিকারের জন্য বড় ধরনের হুমকি।মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, এ বছর সাত মাসে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৪৯২ জন নারী ও শিশু, যেখানে গত বছর একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ২৯২ জন। শিশুর প্রতি সহিংসতা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৪০ জনে, যা গত বছর ছিল ৪৬৩ জন। একই সময়ে পারিবারিক সহিংসতার ঘটনাও বেড়েছে প্রায় ১৬ শতাংশ।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের প্রতিবেদনেও একই চিত্র পাওয়া গেছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৪০৫ জন, সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার ১১৭ জন, ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৫ জনকে। গত বছর এ সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ২৫৩, ১০৫ এবং ১৮।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র দিয়েছে মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ)। সংস্থাটির তথ্যমতে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৫০২ জন নারী ও শিশু, যার মধ্যে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার ১৩৩ জন। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ২৭ জনকে, আর ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে ২০৯ জনকে। (খবর: যায়যায়দিন ২৪ আগষ্ট, ২০২৫)

গত এক বছর ধরে আমাদের চোখের সামনে ঘটে চলছে নানা কিছু। নারী ফুটবল দলের খেলোয়াড়কে ধর্ষণ হুমকি, নারীদের ফুটবল ম্যাচে হামলা, বইমেলায় স্যানেটারি ন্যাপকিনের স্টলে হামলা ও স্টল বন্ধ করতে বাধ্য করা, রাজু ভাস্কর্যের নারী প্রতিকৃতিকে হিজাব পরানো, নারীর কুশপুত্তলিকা তৈরি করে তাতে জুতা পেটা, শাড়ি খুলে নেয়া এই সবই নারীর প্রতি বিদ্বেষ, ঘৃণা ও বিকৃত মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ।

গত ২৯ জুন কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলায় এক ভয়াবহ ঘটনা ঘটে। সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের ২১ বছর বয়সী এক নারী নিজ বাড়িতে ধর্ষণের শিকার হন। ধর্ষণের পর ভুক্তভোগীর ভিডিও অনলাইনে আপলোড করা হয় এবং তা মূহুর্তেই ছড়িয়ে পরে সকলের ফোনে ফোনে। যেখানে ধর্ষণের শিকার ব্যক্তির নাম-পরিচয় প্রকাশ করা নিষেধ, সেখানে তার নগ্ন ভিডিও ধারণ করে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। অনলাইনে তার ভিডিও ছড়িয়ে তাকে দ্বিতীয় বার লাঞ্ছনা করা হয়েছে। পরবর্তীতে তার করা ধর্ষণ মামলা তুলে নিতে চাপ প্রয়োগ করছে অপরাধীরা।

বান্দরবানে খিয়াং নারী ‘চিংমা খিয়াং’ এর লাশ মেলে মে মাসে। নিহতের শরীরে রক্তাক্ত আঘাতের চিহ্ন ও বিবস্ত্র অবস্থায় লাশ পাওয়া যায়। পুলিশ ধারণা করে, ধর্ষণের পর হত্যা।

এপ্রিল মাসে নড়াইলের লোহাগড়ায় এক বাকপ্রতিবন্ধী তরুণী ধর্ষণের শিকার হয়। ঘটনা ধামাচাপা দিতে স্থানীয় মাতব্বররা মীমাংসার নামে অভিযুক্ত উলফতকে ২ লাখ টাকা জরিমানা করে।

এর আগে মার্চ মাসে মাগুরা সদরে ৮ বছর বয়সী এক শিশু বোনের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে বোনের শ্বশুর ও স্বামী দ্বারা ধর্ষণের শিকার হয়। তার ওপর পাশবিক নির্যাতন চালানো হয়, শরীরের ভিতরে বাহিরে ভয়ঙ্কর ক্ষত চিহ্ন পাওয়া যায়। ঢাকায় তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য আনা হলেও সে শেষমেশ মারা যায়। প্রধান অভিযুক্ত হিতু শেখকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, তবে সহযোগীদের বিচার এখনো সম্পূর্ণ হয়নি।

ধর্ষণের পর মোবাইলে ভিডিও ধারণ, তা ফেসবুকের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া— এসব যেন দ্বিতীয়বার ধর্ষণ। ভুক্তভোগী নারী শুধু শরীরেই নয়, সামাজিকভাবে, মানসিকভাবে বারবার ধর্ষিত হচ্ছেন। অনেকে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন, অনেকে জীবিত থেকেও মৃতের মতো জীবনযাপন করছেন।

এসব তো আলোচিত কিছু ঘটনা। এছাড়া প্রতিদিন কোথাও না কোথাও হয়ে চলেছে নারী সহিংসতার শিকার। বাসে নারী ধর্ষণের শিকার, কর্মক্ষেত্রে ধর্ষণের শিকার, আত্মীয়ের বাড়ি যেয়ে ধর্ষণের শিকার, নিজ বাড়িতে ধর্ষণের শিকার, কখনো স্বামীকে বেঁধে রেখে তার সামনে স্ত্রীকে ধর্ষণ, কখনো ধর্ষণ করার ভিডিও ধারণ করে পরবর্তীতে ব্ল্যাকমেইল করে একাধিক বার ধর্ষণ করছে। হয়ে চলেছে একের পর এক হত্যা, বিভিন্ন জায়গায় মরদেহ উদ্ধার।

তাছাড়া নির্যাতন, রাস্তা ঘাটে  মব তৈরি করে অপমান, গায়ে হাত, গায়ে পানের পিক ছুড়ে মারা, প্রকাশ্যে পোশাক নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করা, এমন আরো বহু ঘটনা ঘটেই চলেছে। পাহাড়- সমতল, গ্রাম- শহর, শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধা, প্রতিবন্ধী, গর্ভবতী কেউ রক্ষে পায় না। ঘরে বা বাইরে, নারী ও শিশুরা কোথায় নিরাপদ?

এছাড়া ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঢেউ। সংখ্যালঘুদের ওপর নেমে আসে ভয়াবহ আঘাত। দেশের প্রায় প্রতিটি জেলায় হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর, দোকানপাট, মন্দিরে হামলা চালানো হচ্ছে। বহু নারী লাঞ্ছিত হন, ধর্ষণের অভিযোগ উঠে। কেউ কেউ নিখোঁজ হন। এসব ঘটনায় প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা এবং অনেক ক্ষেত্রেই সরাসরি ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। আন্তর্জাতিক মহলও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে – কিন্তু দেশের ভেতরের পরিস্থিতি কিছুই বদলায়নি। এতো এতো প্রমাণসহ উদাহরণ থাকার পরেও প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “দেশে অপরাধের সংখ্যা বাড়েনি।”

এতসব ঘটনার পরেও বিচারহীনতা, অপরাধীদের উৎসাহিত করে চলেছে। অধিকাংশ ধর্ষণ মামলাতেই চার্জশিট দাখিল হয় না, ভুক্তভোগীরা মামলা করতে ভয় পান, মামলা বা লোক জানাজানি হলে, তাদের হত্যা করা হবে বলে ভয় দেখানো হয়। কখনো সালিশ করে ধর্ষককে চড় থাপড় দিয়ে মিটমাট করার চেষ্টা করা হয়। সামাজিক লজ্জা, হুমকির কারণে অধিকাংশ ঘটনা আড়ালেই থেকে যায়।

বর্তমানে মৌলবাদীরা মব তৈরি করে থানা থেকে অপরাধীকে ছাড়িয়ে আনছে। অপরাধীকে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে ভিক্টিমের নাম, ঠিকানা থানা থেকে সংগ্রহ করে বাদীকে হুমকি দিচ্ছে, এমন ঘটনাও ঘটেছে। একের পর এক আসামি জেল থেকে ছাড়া পাচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের সাজা প্রাপ্ত আসামিকে জামিন দিচ্ছে।

পরিস্থিতি এমন যে, এসব ঘটনার প্রতিবাদ করার যৌক্তিকতা নিয়ে আজ সংশয় তৈরি হচ্ছে। বিচার কার কাছে চাইবো? কতগুলো ঘটনার বিচার চাইবো? এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে হলে আমাদের কি করতে হবে? এর শেষ কোথায়? আমরা ১৯৭১ সালের বর্বরতা পড়েছি বইয়ে, জেনেছি প্রবীণদের মুখে। কিন্তু আজকের বাংলাদেশের বাস্তবতা যেন সেই ইতিহাসকে চোখের সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। নারীদের যদি নিরাপত্তা না থাকে তাহলে নারী বাঁচবে কি করে? সর্বক্ষণ আতংক নিয়ে কি বেঁচে থাকা যায়?

[ফেমিনিস্ট ফ্যাক্টরে প্রকাশিত মুক্তমত লেখকের নিজস্ব বক্তব্য]

Leave a Reply