নারী ভোটব্যাংক ও ডানপন্থার নীরব সাফল্য!
নাহিদ আক্তার ।। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি বিষয় ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে; ডানপন্থী ইসলামি রাজনীতি, বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের মিত্র জোট, নারীদের একটি বড় অংশকে সংগঠিতভাবে নিজেদের ভোটব্যাংকে রূপান্তর করতে সক্ষম হয়েছে। বিষয়টি অনেকের জন্য বিস্ময়কর হলেও এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। বরং এটি দীর্ঘদিনের পরিকল্পিত, ধারাবাহিক এবং নীরব রাজনৈতিক কাজের ফল।
জামায়াত ও তাদের শরিকরা গ্রামাঞ্চলের নারীদের পাশাপাশি শহরের বিভিন্ন শ্রেণি ও মতের নারীদের লক্ষ্য করে কাজ করেছে। ধর্মীয় আলোচনা, পারিবারিক নেটওয়ার্ক, নারী সংগঠন এবং সামাজিক সম্পর্ককে ব্যবহার করে তারা ঘরে ঘরে পৌঁছেছে। নারীদের “নৈতিক রক্ষক”, “পরিবারের নিরাপত্তা” ও “ধর্মীয় দায়িত্ব”-এর ভাষায় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। এই প্রচারণা কখনো প্রকাশ্যে নয়, বরং সূক্ষ্ম ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছে।
এই কৌশলের সাফল্য সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা গেছে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্রী হল ও শিক্ষার্থী সংসদ নির্বাচনে। সাম্প্রতিক নির্বাচনে দেখা গেছে ডানপন্থী ছাত্রসংগঠনগুলো বিশেষ করে মেয়েদের হলগুলোতে উল্লেখযোগ্য সমর্থন পেয়েছে। ফলাফল অনেকের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে যারা নারীর স্বাধীনতা ও ক্ষমতাকে সংকুচিত করে, তারা কীভাবে নারী শিক্ষার্থীদের ভোটে জয়ী হলো?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের নিজেদের ব্যর্থতাও নির্দ্বিধায় স্বীকার করতে হবে। প্রগতিশীল রাজনীতি ও নারীবাদী আন্দোলনের পাশাপাশি বাংলাদেশের মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোও নারীদের প্রকৃত অর্থে অন্তর্ভুক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে। নারীদের দৈনন্দিন ভয়, অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তাহীনতা ও সামাজিক চাপকে তারা কার্যকর রাজনৈতিক ভাষায় রূপ দিতে পারেনি। নারীরা ভোটার হিসেবে প্রয়োজনীয় হলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রে তারা বরাবরই উপেক্ষিত।
সংসদ নির্বাচনে নারীর ভোটগ্রহণের হার বাড়লেও বাস্তবতা হলো ৫১টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৩০টির কোনো নারী প্রার্থী নেই এবং মোট নারী প্রার্থীর সংখ্যা মাত্র ৪ শতাংশ। অর্থাৎ রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রে নারীর উপস্থিতি এখনো প্রতীকী ও সীমিত। মূলধারার দলগুলো নারীকে ভোটের উৎস হিসেবে দেখেছে, ক্ষমতার অংশীদার হিসেবে নয়। এই শূন্যস্থানটিই ডানপন্থীরা দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগিয়েছে।
যেখানে ডানপন্থী ইসলামি শক্তিগুলো নারীদের সরাসরি বলেছে “আমরা তোমাদের রক্ষা করব”, “আমরাই তোমাদের ধর্ম ও সম্মান বাঁচাব” সেখানে প্রগতিশীল রাজনীতি নারী ভোটার বা নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে ধারাবাহিক ও বাস্তবভিত্তিক চিন্তা থেকে দূরে থেকেছে। নারীবাদী আন্দোলনও প্রান্তিক নারীদের সঙ্গে সহযোগিতার জায়গা তৈরি করতে পারেনি। আমরা যেখানে সাংস্কৃতিক ও সামাজিকভাবে অনুপস্থিত থেকেছি, সেখানেই জামায়াত ও তাদের মিত্রদের প্রবেশ ঘটেছে।
নারীর বাস্তব জীবনের ভয়, ধর্মীয় চাপ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার জায়গায় নিয়মিত উপস্থিতি না থাকায় সেই শূন্যস্থান পূরণ করেছে জামায়াত ও ডানপন্থী জোট। তাদের নারীদের কাছে পৌঁছানো কোনো সাময়িক কৌশল নয়; এটি একটি দীর্ঘকালীন সংগঠিত প্রচেষ্টা। ডিজিটাল প্রচার ও মাঠপর্যায়ের গোপন কিন্তু ধারাবাহিক ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে তারা নারীদের ধর্ম, পরকাল ও নৈতিকতার ভাষায় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত করেছে। বাস্তবে তারা নারীর ক্ষমতা সংকুচিত করে, কিন্তু স্বর্গ ও পরকালের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সমর্থন আদায় করতে সক্ষম হয়েছে।
বিশেষভাবে উদ্বেগজনক হলো কম শিক্ষিত এবং সামাজিক চাপে থাকা বিপুলসংখ্যক নারী এই ভাষায় আকৃষ্ট হয়েছে। এর প্রতিফলন দেখা গেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংসদ নির্বাচন ও মেয়েদের হলগুলোতে, যেখানে নারীর ক্ষমতা সীমিতকারী রাজনৈতিক প্রতিনিধিরা নারীর ভোটে জয়ী হয়েছে। এখানে নারীরা মুক্তির নয়, বরং ব্যবহারের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।
এই সাফল্য কেবল নারী ভোটে সীমাবদ্ধ নয়; এটি দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক শক্তির ভারসাম্যে একটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। কারণ যে রাজনীতি নারীর ক্ষমতা সংকুচিত করে, সেই রাজনীতি যদি নারীর সমর্থনেই শক্তিশালী হয়, তবে প্রশ্ন থেকেই যায় নারীর সত্যিকারের নেতৃত্ব ও সমান অংশগ্রহণ কোথায় দাঁড়িয়ে আছে?
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এই ডানপন্থী শক্তিগুলো গত শাসনামলেও থেমে থাকেনি। প্রকাশ্যে রাজনীতি সীমিত থাকলেও মাঠপর্যায়ে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কাজ তারা অব্যাহত রেখেছে। মাদ্রাসা, সামাজিক সহায়তা, ধর্মীয় শিক্ষা ও নারী সংগঠন মিলিয়ে তারা একটি বিকল্প সামাজিক কাঠামো তৈরি করেছে। ফলে রাজনৈতিক সুযোগ আসামাত্র তারা প্রস্তুত ছিল।
এই বাস্তবতা আমাদের জন্য শুধু সতর্কবার্তা নয়; এটি একটি কঠিন রাজনৈতিক রায়। ডানপন্থী রাজনীতির উত্থান কোনো আকস্মিক ধর্মীয় আবেগের ফল নয়, বরং সংগঠন, সময়োপযোগী কৌশল এবং নিরবচ্ছিন্ন মাঠপর্যায়ের কাজের পরিণতি। তারা অপেক্ষা করেছে, প্রস্তুতি নিয়েছে এবং সুযোগের মুহূর্তে সামনে এসেছে।
এর বিপরীতে নারীবাদী ও প্রগতিশীল রাজনীতির ব্যর্থতা কেবল রাষ্ট্রীয় দমন বা সেন্সরের ফল বলে দায় এড়ানো যাবে না। সত্য হলো বাংলাদেশে নারীবাদী গ্রুপগুলো প্রকৃত অর্থে কখনোই একে অপরের সঙ্গে সহযোগিতা করতে পারেনি। বিভাজন, নেতৃত্ব সংকট ও শ্রেণিগত দূরত্ব তাদের দুর্বল করেছে। সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো নারীদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ও সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে না পারা।
নারীবাদ অনেক সময় প্রকল্পভিত্তিক আলোচনা, সেমিনার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সীমাবদ্ধ থেকেছে। মাঠে নারীর দৈনন্দিন বাস্তবতায় ধারাবাহিক উপস্থিতি না থাকায় নারীরা যেখানে শোনা গেছে, যেখানে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে, সেখানেই তারা যুক্ত হয়েছে even যদি সেটি নারীবিরোধী কাঠামোর ভেতরেও হয়।
এই বিভাজন ও সংযোগহীনতা প্রগতিশীল রাজনীতিকে ক্রমশ প্রান্তিক করেছে। এটি কোনো তাত্ত্বিক সমস্যা নয়; এটি একটি রাজনৈতিক ব্যর্থতা। যতদিন নারীবাদ নিজের ভেতরের এই সত্যটি স্বীকার না করবে, ততদিন ডানপন্থার এই নীরব কিন্তু কার্যকর অগ্রযাত্রা থামানো যাবে না।
নারী ভোটব্যাংককে অবহেলা করার সময় শেষ। নারীদের রাজনৈতিক চেতনা কেবল স্লোগান দিয়ে তৈরি হয় না। নিরাপত্তা, মর্যাদা, অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও সামাজিক স্বীকৃতির প্রশ্নের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না হলে নারীর ভোট অন্য জায়গায় চলে যাবে যাচাই না করেই।
প্রশ্ন এখন আর কেন ডানপন্থীরা জিতছে তা নয়। প্রশ্ন হলো প্রগতিশীল রাজনীতি ও নারীবাদ কি নিজেদের কৌশল নতুন করে ভাবতে প্রস্তুত? যদি না হয়, তাহলে এই নীরব সাফল্য আরও দৃশ্যমান হবে আর তখন বিস্মিত হওয়ার সুযোগও থাকবে না।
[ফেমিনিস্ট ফ্যাক্টরে প্রকাশিত কলাম লেখকের নিজস্ব বক্তব্য]

