March 7, 2026
কলামফিচার ২

নারী নেতৃত্বের ইতিহাস বনাম বর্তমান ও ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ!

ড. মাহমুদ হাসান টিপু ।। বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারী নেতৃত্ব নিয়ে আমরা সারাজীবন গর্ব করে এসেছি। পৃথিবীতে খুব কম দেশই ছিল যেখানে প্রধানমন্ত্রী নারী, প্রধান বিরোধীদলের প্রধান নারী, তিন নম্বর জনপ্রিয় দলের প্রধানও নারী (রওশন এরশাদ)। একটা মুসলিম প্রধান দেশ ৩৪ বছর শাসন করেছে দুইজন নারী। এটা ইতিহাসে বিরল। পাকিস্তানে বেনজির ভুট্টো তিন বছরের জন্য প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। ইন্দোনেশিয়ায় মেঘবতী সুকর্নপুত্রীও তিন বছরের জন্য রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন। অন্যদিকে, দক্ষিণ এশিয়ার দুই দেশে নারী সরকারপ্রধান ছিলেন। ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী দুই মেয়াদের প্রায় ১৫ বছর প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। শ্রীলংকায় বর্তমান সরকারপ্রধান হচ্ছেন হরিণী অমরসূর্য। এর আগে শ্রীলংকার শ্রীমাভো বন্দরনায়েকে ছিলেন বিশ্বের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। ১৯৬০ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদে তিনি সিলন ও শ্রীলংকার প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপ্রধান এবং বিরোধীদলের প্রধান হয়েছিলেন।

মিলিটারি শাসক থেকে স্বৈরাচার হয়ে ওঠা এরশাদের শাসনামলে রাজপথের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া দুই প্রধান নেতৃত্ব ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা। ছাত্র আন্দোলনের সাথে এই দুই রাজনৈতিক নেতার নেতৃত্বে প্রবল আন্দোলনের ফলে ১৯৯০ সালে এরশাদের পতন হলে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু হয় এই দুই নেত্রীর মাধ্যমে। ১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে খালেদা জিয়া প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন এবং এর পরের ৩৪ বছর বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী থাকেন দুই নারী নেত্রী। ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০১ সালের নির্বাচন পর্যন্ত প্রথমবারের জন্য এবং ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ের জন্য প্রধানমন্ত্রী থাকেন শেখ হাসিনা। খালেদা জিয়া ২০০১ সালের নির্বাচনে জিতে আবার প্রধানমন্ত্রী হন।

বর্তমান প্রেক্ষিতে বাংলাদেশে অদূর ভবিষ্যতে নারী নেতৃত্ব আসবে কিনা সেই সম্ভাবনা প্রায় নাই বললেই চলে। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া মারা গেছেন। আরেকজন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে নির্বাসিত আছেন। দুইদিন আগে তার ছেলে জয় ইঙ্গিত দিয়েছেন যে শেখ হাসিনার আর রাজনীতিতে ফেরা নাও হতে পারে। ফলে এই দুই প্রধান দলে নতুন কোনো নারী নেতৃত্ব না আসলে বাংলাদেশে নারী সরকারপ্রধান আবার কবে আসবে বলা মুশকিল।

৩৪ বছর দেশে নারী সরকারপ্রধান থাকাকালে নারীর ক্ষমতায়ন ও উন্নয়ন খুব না হলেও, বর্তমানে রাজনীতির যে ধারা চলছে তাতে নারীর ক্ষমতায়নের সুযোগ প্রায় বন্ধ হয়েই গেছে। আওয়ামী লীগবিহীন আগামী সংসদ নির্বাচনে নারীদের অংশগ্রহণের যে পরিসংখ্যান সেটা দেখলেই বুঝবেন, নারী নেত্রীরা কি পরিমাণ বঞ্চনার শিকার হয়েছেন! নির্বাচনে অংশ নেওয়া ৫১ টি দলের মধ্যে জামায়াতসহ ৩০টি দলে কোনো নারী প্রার্থী নাই। সব মিলিয়ে এবার নির্বাচনে নারী প্রার্থীর আনুপাতিক হার সাড়ে তিন শতাংশ। ইনক্লুসিভ বলে প্রচার করা এবারের নির্বাচনে ১৯৯১ জন বৈধ প্রার্থীর মধ্যে নারী হলেন মাত্র ৬৫ জন। অথচ আওয়ামী লীগের ‘একতরফা’ নির্বাচনের মধ্যে ২০২৪ এর নির্বাচনে নারী প্রার্থী ছিল ৯৪ জন। ২০১৮ সালে ছিল ৬৯ জন এবং ২০১৪ সালে ছিল সাড়ে ৫ শতাংশের বেশি।

দেশে প্রথম নারী সাংসদ নির্বাচিত হন তৃতীয় সংসদে ১৯৭৯ সালে। এরপর ১৯৮৬ সালে পাঁচজন, ১৯৮৮ সালে চারজন নারী সরাসরি নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালের হিসাব অনুযায়ী ৩৯ জন প্রার্থীর মধ্যে ৫ জন, ১৯৯৬ সালের জুন মাসের নির্বাচনে ৩৬ প্রার্থীর মধ্যে ৮ জন, ২০০১ সালের নির্বাচনে ৩৮ জন প্রার্থীর মধ্যে ৬ জন, ২০০৮ সালের নির্বাচনে ৫৯ জন প্রার্থীর মধ্যে ১৯ জন, ২০১৪ সালের নির্বাচনে ২৯ প্রার্থীর মধ্যে ১৮ জন নারী নির্বাচিত হয়ে সংসদে যান।

দেশের প্রায় অর্ধেকের মতো ভোটার নারী। সংস্কার করতে আসা ইনটেরিম সরকারের তৈরি জুলাই সনদে কমপক্ষে ৫% নারী প্রার্থী নিশ্চিতের কথা বলা হলেও (ধীরে ধীরে তা ৩৩% শতাংশে উন্নীত করতে হবে) দলগুলো, বিশেষ করে ক্ষমতায় যেতে চাওয়া জামায়াতে ইসলামীসহ ইসলামিদলগুলো সংস্কারবাদী সরকারকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে নারীদেরকে ক্ষমতায় যাওয়ার প্রচেষ্টার বাইরে রেখেছে।

১২ই ফেব্রুরারির নির্বাচনে ক্ষমতার দাবীদার জামায়াতের নারী প্রার্থী ০ জন। তাদের জোটের ইসলামী দলগুলোতে কোনো নারী প্রার্থী নাই। এই জোটে ৩০টি আসনে প্রার্থী দেওয়া ইনক্লুসিভ পার্টি বলে জাহির করা কিংস পার্টি – এনসিপির নারী প্রার্থীর সংখ্যা ২ জন (মাহমুদা মিতু জামায়াতকে আসন ছেড়ে দিয়েছে)। বিএনপির নেতৃত্বে জোটে ৩০০ আসনে মোট নারী প্রার্থীর মাত্র ৩% অর্থ্যাৎ ৯ জন নারী প্রার্থী। নতুন নিবন্ধিত দল বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ-মার্ক্সবাদী) দলের সর্বমোট নারী প্রার্থী বিএনপির সমান সংখ্যক নয়জন, যা তাদের মোট প্রার্থীর এক-তৃতীয়াংশ। এছাড়া জাতীয় পার্টি থেকে নারী প্রার্থীর সংখ্যা ৫ জন। অন্যান্য বিভিন্ন দল থেকে খুবই অল্প সংখ্যক নারী প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নেবেন। রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন সব মিলিয়ে ৭ জন।

বাংলাদেশের নারীর ক্ষমতায়নের গর্ব করার মতো ইতিহাস থাকলেও বর্তমানে রাজনীতিতে নারীদের অবস্থান এতো নাজুক কেন, সেটা বোঝার চেষ্টা করেছিলাম। ২০২৪ সালের সরকার পতনের আন্দোলনে (জুলাই আন্দোলন) আমরা দেখেছি আন্দোলনকারীদের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই ছিল নারী। তাদের অংশগ্রহণ ছিল প্রশংসা পাওয়ার মতো। তাদের মধ্যে অনেকে “নারী কোটার দরকার নাই” বলেও উচ্চকিত ছিল। রাষ্ট্র সংস্কারে অংশ নিতে চেয়েও তাদেরকে পিছিয়ে যেতে দেখেছি। সরকার পতনের পর রাস্তায় অসংখ্য নারীকে ট্রাফিক কন্ট্রোল করতে দেখেছি, বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে দেখেছি, রাস্তা পরিষ্কার করতে দেখেছি, বিভিন্ন সংস্কারে অংশ নিতে আগ্রহী হতে দেখেছি, কিন্তু তাদেরকে হারিয়ে যেতেও দেখেছি।

আন্দোলনে অংশ নেওয়া এবং উড়ে এসে জুড়ে বসা অনেক নারীকে দেখেছি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিভিন্ন কাজে ঢুকে যেতে। অনেককে দেখেছি রাজনীতিতে যোগ দিতে। সরকারের তত্ত্বাবধানে গড়ে ওঠা বিভ্রান্ত ও ডানপন্থী দলে প্রগতিশীল নারীদের অংশগ্রহণ দেখে অনেকে আশাবাদী হয়েছিল। সেই দলের একটা বড় অংশ যে নারীদের অংশগ্রহণ মেনে নিতে পারেনি, সেটা আমরা দেখলাম নির্বাচনের জন্য মনোনয়ন এবং পরবর্তীতে জামায়াতের সাথে জোটবদ্ধ হওয়া দেখে। মুখ নাক কান বন্ধ করে টিকে থাকা তরুণ সেই নারীরা এরপর একে একে দল থেকে বের হয়ে গেলেন। কৌশলে তাদেরকে নির্বাচনও করতে দেওয়া হলো না।

অথচ আমরা দেখেছিলাম শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর নারীরা নতুন বন্দোবস্তর স্বপ্ন দেখে এগিয়ে এসেছিল। জামায়াত প্রভাবিত সরকারের কৌশলের কারণে নারীরা ছিটকে পড়েছে বলে আমার ধারণা। জামায়াত জোট নারী ক্ষমতায়ন বিরোধী। এই জোটে তরুনদের দল, যাদেরকে বলা হয় জামায়াতের সি টিম, সেই নাগরিক পার্টিও নারীর ক্ষমতায়নের বিরোধী বলেই মনে হয়েছে। যে তরুন নারীরা এই দলের সাথে পুরো এক বছর থাকলো, তারা যখন দলের পলিসির কারণে বের হয়ে গেল, এনসিপির মূল নেতৃত্বে থাকা নেতারা তাদেরকে ফেরানোর ন্যূনতম চেষ্টা করেনি। উল্টো তারা তাদের অন্তর্নিহিত আশার বাস্তবায়ন হতে দেখে খুশি হয়েছে বলে মনে হয়েছে আমার।

বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়ন ও উন্নয়নের পথ রুদ্ধ হয়ে গেছে। এখন তালিবান শাসকদের মতো নারীদের গৃহে বন্দি করার পথ সুগম হয়েছে। আমাদের গর্ব করার মতো ৩৪ বছরকে আমরা শুধু স্মরণ করেই জীবন কাটিয়ে দেব, এক সময় মারা যাবো। কিন্তু নারীর ক্ষমতায়ন আর দেখতে পারবো বলে মনে হয় না!

 

ডঃ মাহমুদ হাসান টিপু 
সহযোগী অধ্যাপক, ল এন্ড লিগ্যাল স্টাডিজ ডিপার্টমেন্ট
কার্লটন ইউনিভার্সিটি, অটোয়া, কানাডা

[ফেমিনিস্ট ফ্যাক্টরে প্রকাশিত কলাম লেখকের নিজস্ব মতামত]

Leave a Reply