আইন আছে; তবু নারী আইনের কাছে যেতে দ্বিধা করে কেন?
তাসনিয়া আল সুলতানা ।। গত সপ্তাহেই নেটফ্লিক্সে একটি সিনেমা দেখলাম। অনেকেই দেখেছেন হয়তো। সিনেমার নাম “Haq” যার বাংলা অর্থ করলে দাঁড়ায় “অধিকার”। এটি কোন কাল্পনিক ঘটনা নিয়ে নির্মিত সিনেমা নয়, সিনেমাটি নির্মিত হয়েছে ভারতের বিখ্যাত “শাহ বানো বেগম বনাম মোঃ আহমেদ খান” যা ১৯৭৮ সালের ভারতের শাহ বানো মামলা নামে পরিচিত, সেই মামলার উপর। এই মামলায় ভারতের সুপ্রীম কোর্ট ১৯৮৫ সালে তালাকপ্রাপ্ত মুসলিম নারীদের ভরনপোষণের পক্ষে রায় দিয়েছিল। দীর্ঘ ৭ বছরের এই আইনী লড়াইয়ে প্রাপ্ত রায়ের মাধ্যমে শাহ বানো জয়ী হলেও পরবর্তীতে ভারতের কংগ্রেস সরকার আইন প্রণয়ন করে তালাকপ্রাপ্ত মুসলিম নারীদের অধিকার ইদ্দতকালীন সময় (তালাক প্রদানের পরবর্তী ৩ মাস) পর্যন্ত সীমাবদ্ধ করে। বাংলাদেশের ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশেও তালাকপ্রাপ্ত নারীর ভরনপোষণের অধিকার তার তালাক পরবর্তী ইদ্দতকালীন সময় পর্যন্ত সীমাবদ্ধ করা আছে।
একটা বিষয় লক্ষ্যণীয়, আইন তৈরি হয় সমসাময়িক ঘটনা, প্রেক্ষাপট এবং প্রয়োজনীয়তার উপর ভিত্তি করে। পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় নারীরা যেহেতু সর্বদাই নিগৃহীত এবং বৈষম্যের স্বীকার সেহেতু নারীর প্রতি নির্যাতনের ধরণ ও মাত্রানুযায়ী দেশের আইন ব্যবস্থাতেও পরিবর্তন এসেছে নারীর সুরক্ষায় নতুন নতুন আইন প্রণয়নের মাধ্যমে। বর্তমানে বাংলাদেশে নারীর প্রতি নির্যাতন এবং বিভিন্ন ধরণের সহিংসতা ও বৈষম্য প্রতিরোধে প্রাসঙ্গিক অনেক আইন রয়েছে। যেমন- নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০, যৌতুক নিরোধ আইন ২০১৮, পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন ২০১০, পারিবারিক আদালত আইন, ডিজিটাল নিরাপত্তা অধ্যাদেশ ২০২৫, এমনকি শ্রম আইন ২০০৬-এ কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি, নারীর নিরাপত্তা ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ সংক্রান্ত ধারাগুলো—সব মিলিয়ে বলা যায়, বাংলাদেশে নারীর সুরক্ষায় বর্তমান আইনগত কাঠামো যথেষ্ট শক্তিশালী। কিন্তু যদি আমরা বাস্তব প্রেক্ষাপটের দিকে তাকাই, তখন দেখা যায় বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো।
পরিবার বা সমাজে যখন কোনো নারী নির্যাতনের শিকার হন, তালাকপ্রাপ্ত হন বা কর্মস্থলে বৈষম্য বা হয়রানির মুখোমুখি হন, তখন খুব কম সংখ্যক নারীই আইনের আশ্রয় নেওয়ার জন্য উদ্যোগী হন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, নারীরা তাদের সাথে হওয়া অত্যাচার নীরবে সহ্য করেন, অনেকসময় তারা পারিবারিক বা সামাজিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করেন। প্রশ্ন আসে—আইন তো আছে, তবুও মেয়েরা আইনের দ্বারস্থ হতে চায় না কেন?
একজন আইনজীবী হিসেবে মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে আমি দেখেছি, নারীরা আইনের দ্বারস্থ না হওয়ার প্রথম ও প্রধান কারণ হলো ভয়। আইন ও সালিস কেন্দ্রের ২০২৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশে ২০২৫ সালে ধর্ষণের শিকার নারীর সংখ্যা ৭৪৯ জন। এখন এটা ভাবলে ভুল হবে যে, ২০২৫ সালে এই ৭৪৯ জন নারীই ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এই সংখ্যাটি রিপোর্টেড অথবা জ্ঞাত ধর্ষণের সংখ্যা অর্থাৎ যেসব ধর্ষণের ঘটনায় থানা কিংবা আদালতে মামলা দায়ের হয়েছে। এই সংখ্যাটি বাদ দিলে অজ্ঞাত বা আনরিপোর্টেড ধর্ষণের সংখ্যা অগণিত। ধর্ষণের মতো ঘটনার শিকার হওয়ার পরও “ভয়” এর কারণে আজও অনেক মেয়ে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নিতে পিছপা হয়। এই ভয় কেবল পুলিশের কাছে যাওয়া বা আদালতে দাঁড়ানোর নয়, এটি হল সামাজিক প্রতিক্রিয়ার ভয়। ২০২৬ ইংরেজি সালে এসেও আমাদের সমাজে এমন একটি ধারণা প্রবল—নারী যদি নিজের অধিকারের জন্য আইনি পদক্ষেপ নিতে উদ্যোগী হন, তবে সে নারীর চরিত্রে “সমস্যা” আছে অথবা সেই নারী “মামলাবাজ”। আমি এমন এক সভ্রান্ত এবং আর্থিকভাবে সচ্ছল পরিবারের মেয়েকে ব্যক্তিগতভাবে চিনি যে স্বামীর দ্বারা শারিরীকভাবে মারাত্মক নির্যাতনের শিকার হওয়ার পরও কেবল সামাজিকভাবে “অসম্মানিত” হওয়ার ভয়ে কোন আওয়াজ তোলে নি; কারণ তার পরিবার, বিশেষ করে বাবা-মা এবং নিকটাত্মীয়রা বলেন “আমাদের বংশের কেউ কোন বিষয়ে থানা-পুলিশের সরণাপন্ন হয় নি। এরকম একটা পরিবারের মেয়ে নিজের স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা করলে সমাজে আর মুখ দেখানো যাবে না।” এই তথাকথিত সামাজিক ভয় মেয়েটির সকল সাহস আর আত্মবিশ্বাস নিমিষেই গুঁড়িয়ে দিয়েছে। যে সমাজে ধর্ষণের জন্য এখনও নারীর পোশাককেই দায়ী করা হয়, স্বামীর দ্বারা নির্যাতিত হলে ওই স্বামীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো তাকে আঁচলে বেধে রাখার জ্ঞান দেওয়া হয়, সেই সমাজে প্রতিবাদ করা বা আওয়াজ তোলা নারীর চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা অস্বাভাবিক কিছু নয়।
তাছাড়া নারীর আর্থিক ও সামাজিক নির্ভরতার সমস্যা আইনী পদক্ষেপ না নেওয়ার দ্বিতীয় কারণ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। বাংলাদেশের বেশিরভাগ নারী অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী নন। অনেক নারী তো আবার স্বামী-সন্তানের দেখভালের কথা চিন্তা করে স্বেচ্ছায় হাসিমুখে তাদের ক্যারিয়ার বিসর্জন দেন। ফলে তারা সংসারের আয়-ব্যয়ের জন্য সম্পূর্ণভাবে স্বামীর উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। ফলে নির্যাতিত হলে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কারণে যদি আর্থিক সহায়তা বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে তাদের ও সন্তানদের জীবনে যে বাস্তব সংকট তৈরি হবে, সেটি তারা আগে থেকেই আঁচ করতে পারেন। এজন্য অনেক নারী অন্যায় মেনেও চুপ থাকাকে নিরাপদ মনে করেন। আবার স্বামীর সংসার ছেড়ে আসার পর বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পিত্রালয়ের লোকজন নারীকে আর গ্রহণ করতে চান না। ফলে মাথার উপর একটা ছাদ আর দু’বেলা খাবারের নিশ্চয়তার কারণে হাজারো নির্যাতন নারীরা মুখ বুজে সহ্য করে যাচ্ছেন বছরের পর বছর।
আইনি প্রক্রিয়ার জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতা অনেক সময় নারীদের নিরুৎসাহিত করে। একটি মামলা দায়ের করতে গেলে থানায় এফআইআর, মেডিকেল পরীক্ষা, প্রতিবেদন প্রাপ্তিতে সময়ক্ষেপণ, আদালতে হাজিরা, সাক্ষী, যুক্তিতর্ক, রায়—সব মিলিয়ে পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ ও মানসিকভাবে ক্লান্তিকর। অনেক নারী মনে করেন, এই লম্বা চওড়া ঝামেলায় গিয়ে আদতে কোনো লাভ নেই; বিশেষ করে প্রান্তিক নারী, তাদের জন্য আদালতে যাওয়া মানেই সময়, খরচ ও মানসিক কষ্ট—সব একসঙ্গে। আবার আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংবেদনশীলতার অভাবও একটি বড় কারণ বলে বিবেচিত হতে পারে। প্রতিটি থানায় আলাদা করে নারী ও শিশু হেল্প ডেস্ক থাকলেও অনেক নারী, নারী পুলিশ কর্মকর্তার দ্বারাই অপ্রাসঙ্গিক এবং অনুপুযুক্ত প্রশ্ন, বিদ্রূপ বা ঠাট্টার মুখোমুখি হন। এত প্রচন্ড অপমানিত বোধ হওয়াটাই স্বাভাবিক। আবার আদালতে দাঁড়ানোর পর আসামীপক্ষের আইনজীবী ভুক্তভোগী নারীকে যেসকল চটকদার প্রশ্নবানে জর্জরিত করেন, এটিকে পুনরায় নির্যাতন বললেও ভুল হবে না। আইনের যে প্রতিষ্ঠানগুলো নারীর আশ্রয়স্থল হওয়ার কথা, সেখানেই যদি তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, তবে আইন তাদের কাছে ভয়াবহ এক অভিজ্ঞতা হয়ে দাঁড়ায়।
তবে আশার কথা হলো, কিছুটা হলেও এখন পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। শিক্ষা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং নারীবান্ধব সংগঠনগুলোর সচেতনতামূলক কাজের ফলে অনেক নারী এখন জানেন যে আইন তাদের পাশে আছে। শহর এবং প্রান্তিক পর্যায়ে এখন অনেক নারী যৌতুক, নির্যাতন বা ভরণপোষণ সংক্রান্ত মামলায় আইনি পদক্ষেপ নিচ্ছেন। এছাড়া সরকারি ও বেসরকারি আইন সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান যেমন—জেলা লিগ্যাল এইড অফিস, ভিক্টিম সাপোর্ট সেন্টার, ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার, ব্লাস্ট, আইন ও সালিস কেন্দ্র, জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি — এই প্রতিষ্ঠান গুলো নারীদের আইনী সেবা প্রাপ্তির পথ সহজতর করে দিচ্ছে।
একজন আইনজীবীর দৃষ্টিকোণ থেকে আমার মনে হয়, আইনকে নারীর কাছে সহজবোধ্য ও মানবিকভাবে উপস্থাপন করাই এখন সবচেয়ে জরুরি। আইন কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকলে তার কোন মূল্য নেই। প্রয়োজন, নারীরা যেন জানেন—কীভাবে, কোথায়, কখন আইনের দ্বারস্থ হতে হবে। এজন্য স্কুল-কলেজ পর্যায়ে আইনি সচেতনতা বিষয়ক কর্মশালা বা ক্লাস অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। পুলিশ, ম্যাজিস্ট্রেট, এমনকি আইনজীবীদেরও বিশেষ প্রশিক্ষণ থাকা উচিত যেন তারা নারী ভুক্তভোগী নারীদের সঙ্গে সহানুভূতিশীল এবং সহমর্মী আচরণ করেন। পাশাপাশি আমাদের সমাজের মানসিকতা বদলাতে হবে। আমাদের সমাজ নারীকে দুই রূপে দেখতে পছন্দ করে – হয় ভিক্টিম না হয় ভিলেন। একটি মেয়ে ভুক্তভোগী হওয়ার পর যদি নিজের অধিকারের জন্য আদালতে দাঁড়ায়, তাহলে সেটা তার সাহসের প্রমাণ, সে কোন ভিলেন নয় এবং ভিক্টিম হয়ে সে সারাজীবন তার ক্ষত বয়ে বেড়াবে না—এই উপলব্ধি সমাজে গড়ে তুলতে হবে।
শুরু করেছিলাম “Haq” সিনেমার কাহিনী দিয়ে। সাজিয়া বানো (শাহ বানো) দীর্ঘ আইনী লড়াই শেষে তার পক্ষে রায় পেয়েছিলেন। কিন্তু এর নেপথ্যে ছিলেন যেই ব্যক্তি, তিনি ছিলেন সাজিয়ার বাবা মৌলভী বশির আনোয়ার। সাজিয়ার আইনি লড়াইয়ের শুরু হয়েছিল তার বাবার হাত ধরেই। সম্পূর্ণ আইনি লড়াইয়ে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি সাজিয়ার সাথেই ছিলেন। সন্তানের দুঃসময়ে, বিশেষ করে সন্তানটি যদি কন্যা হয়, তার যেকোন লড়াইয়ে যদি পরিবারের যথাযথ সমর্থন থাকে, তবে সেই লড়াইয়ে জেতা কঠিন কিছু নয়। এজন্য দরকার সন্তানের জন্মের পর থেকেই সন্তানের পক্ষে পরিবারের নৈতিক সমর্থন- যাতে করে সে তার পারিবারিক এবং সামাজিক দায়িত্ব বুঝে নেওয়ার পাশাপাশি যেকোন অন্যায়ের বিরুদ্ধে যথাযথ আওয়াজ তোলার মাধ্যমে তার ন্যায্য অধিকার সমাজে প্রতিষ্ঠা করতে পারে।
তাসনিয়া আল সুলতানা : স্টাফ ল’ইয়ার, বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড এন্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)

