April 23, 2026
ফিচার ১সাহিত্যবই নিয়ে আলাপ

হুমায়ুন আজাদের “নারী”: একটি পাঠ পর্যালোচনা

আহমেদ ফারুক মীর ।।  হুমায়ুন আজাদের “নারী” বইটি সম্পর্কে অনেকেই বলে থাকেন, “নারী” সিমোন দ্য বোভ্যোয়ারের “দ্য সেকেন্ড সেক্স” বইয়ের অনুকরণে লিখিত এবং এটি কোনো মৌলিক বই নয়। আমি বলবো তারা ‘দ্য সেকেন্ড সেক্স’ বইটির নাম শুনেছেন, পড়েননি। হয়ত অতি উৎসাহীদের কাছ থেকে গালগল্প হিসেবে শুনে থাকবেন।

নারী জাতির অধিকার সম্পর্কে লেখা পৃথিবীর যে কয়েকটি বই আছে সেগুলোর মধ্যে বাংলা ভাষায় লেখা হুমায়ুন আজাদের (১৯৪৭-২০০৪) “নারী” বইটি অন্যতম। বইটি লেখার জন্য লেখক পৃথিবীর তাবৎ নারী বিষয়ক গ্রন্থ নিয়ে গবেষণা করেছেন।

বইটি প্রথম প্রকাশ হয় ১৯৯২ সালে। তারপর তিনটি সংস্করণ এবং বহু পূনঃমুদ্রণের পর ১৯ নভেম্বর ১৯৯৫ সালে সরকার নিষিদ্ধ করে বইটিকে। সাড়ে চার বছর নিষিদ্ধ থাকার পর বইটি তার ন্যায্য অধিকার ফিরে পেয়েছিল ২০০০ সালের ৭ মার্চ। এরপর প্রয়োজনের তাগিদে লেখক বইটির বিভিন্ন অংশে ব্যাপক পরিমার্জন ও পরিবর্ধন করেন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে একটি পূর্ণ অধ্যায়ও সংযোজন করা হয়।

হাজার হাজার বছর ধরে চলতে থাকা দাসপ্রথাকে এক সময় সাধারণ মানুষ ধরেই নিয়েছিল এটি পৃথিবীর মৌলিক নিয়ম। এরিস্টটল, প্লেটোর মত ব্যক্তিরা মনে করতেন, পৃথিবীতে এক শ্রেণির মানুষকে ঈশ্বর কেবলমাত্র দাসবৃত্তির জন্য তৈরি করেছেন, আর অন্য শ্রেণিকে প্রেরণ করেছেন তাদের উপর প্রভুত্ব করার জন্য। কারণ এরিস্টটল বা প্লেটো ছিলেন প্রভুদের মদদপুষ্ট। তাই তারা দাসদের অধিকারের ক্ষেত্রে ছিলেন অন্ধ।

প্রভূশ্রেণির অসংখ্য মানুষ মনে করে, দাসদের যেমন হীন উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে, নারীদেরকেও তেমনি দুর্বল করে তৈরি করা হয়েছে। হুমায়ুন আজাদ নারী গ্রন্থের “নারী ও তার বিধাতা : পুরুষ” অংশে নারী সৃষ্টির রহস্য বর্ণনা করতে গিয়ে [ফ্রিদেজ-১৯৭০] এর রেফারেন্স দিয়েছেন। তিনি বর্ণনা করেন, আদমের প্রথম ভার্যার নাম লিলিথ, এমন এক করালী নারী যার ওপর আরোহনের সাধ্য নেই কোনো পুরুষের। লিলিথ সঙ্গমের সময় আদমের নিচে শুতে রাজি হয়নি। পরবর্তীতে আদম রেগে গিয়ে তাকে ধর্ষণ করার চেষ্টা করলে সে মন্ত্রবলে হাওয়ায় মিশে যায়। তারপর বিধাতা সৃষ্টি করেন হাওয়াকে। হাওয়াকে তৈরি করা হয় তার বাম পাজরের হাড় থেকে। ঠিক এই কারণেই নারী পরিপূর্ণ মানুষ নয়, যা এখনও পর্যন্ত পিতৃতন্ত্রের বদ্ধমূল কুসংস্কার এবং শোষণের মূল শক্তি। এগুলো সবই অবশ্য বিভিন্ন পুরানে বর্ণিত মিথ।

সিগমন্ড ফ্রয়েড হলেন পুরুষতান্ত্রিক মতবাদী দর্শনের এক মহাপুরুষ। তিনি মনে করতেন, নারী তার শিশ্ন হারিয়ে ফেলেছে এবং তিনি একে বলেছেন “খোজাগূঢ়ৈষা”। আসলে কিছু বিকলাঙ্গ মহাপুরুষের জন্যও নারীর অধিকার বলে আজ আর কিছু নেই। ফ্রয়েড, জ্যা জ্যাক রুশো এবং রাসকিনও মনে করতেন নারী প্রাকৃতিকভাবেই দুর্বল এবং অন্তঃপুরে থাকার জন্য সৃষ্টি, আর পুরুষ সৃষ্টি জগত দাপিয়ে বেড়ানোর জন্য। পুরুষ প্রাকৃতিগতভাবেই ধর্ষকামী আর নারী মর্ষকামী (যে মন্থন ভালোবাসে)। এই ধারণা থেকেই পুরুষরা মনে করে নারী মথিত হতে ভালোবাসে। আর পুরুষরা নারীদেরকে মথিত করে। ফ্রয়েড মনে করতেন, নারী হবে সতী এবং স্বামীর কাছে আবেদনময়ী। হুমায়ুন আজাদের মতে, পুরুষরা নারীকে চায় একদিকে মিশনারীর সিস্টাদের মত পবিত্র, আর সেক্স আপিলের সময় বেশ্যার মতো। আমার কাছেও হামায়ুন আজাদের এই কথাটিকে চরম সত্য বলে মনে হয়েছে। যেহেতু আমি একজন পুরুষ, বলতে পারেন এটি আমার কনফেশন। পাঠকরা নিজেদের সাথে মিলিয়ে নিলে নিজের ক্ষেত্রে প্রকৃত সত্যটি বেরিয়ে আসবে।

নারী বইটি পড়ে এমন কিছু বিষয় পাওয়া গিয়েছে, যা আগে জানার সুযোগ হয়নি। বইটি কেবল একটি সাধারণ পাঠ্য বই নয়। এটি মানব জাতি এবং নারী জাতি বিষয়ক অসংখ্য তথ্যের একটি বৃহৎ ভান্ডার। ‘সীতা’ ও ‘রাম’ এর মতো পবিত্র শব্দও আসলে যোনি ও লিঙ্গের ধারণা বহন করে। ‘সীতা’ শব্দের অর্থ হচ্ছে ‘হলরেখা’ বা ‘লাঙ্গলের ফলার দাগ’ আর রাম শব্দটি এসেছে ‘রম্’ ধাতু থেকে, যার অর্থ ‘চাষ করা বা কর্ষণ করা’, আর এক অর্থ হল ‘রমণ’। আদিকাল থেকে পুরুষের চোখে লিঙ্গই সম্রাট। আর নারী যেহেতু তার শিশ্ন হারিয়ে ফেলেছে, সেহেতু নারী এই লিঙ্গ বা শিশ্নকে বরাবরই হিংসা করে। সুতরাং নারীস্বভাবে প্রধান বৈশিষ্ট হচ্ছে ‘শিশ্নসূয়া’। নারী সম্পর্কে ফ্রয়েডের ধারণা এমনই ছিল।

এমনকি জিহোভার মত ফ্রয়েডও মনে করতেন, ‘অ্যানটমি ইজ হার ডেস্টিনি’- শরীরই নিয়তি’। আমার মতে এটি একটি জঘণ্য দৃষ্টিভঙ্গি। নারী গ্রন্থে হুমায়ুন আজাদকে দেখেছি এসব বিখ্যাত ব্যক্তিদের প্রতি তার কথায় করুণা বর্ষণ করতে। হয়ত তারা হতে পারেন যে কোন বিষয়ে বিখ্যাত। কিন্তু নারী বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে তারা বরাবরই একচেটিয়া ধারণা পোষণ করেছেন, যা হুমায়ুন আজাদ তার গ্রন্থে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বর্ণনা করেছেন। তিনি কুন্ঠিত হয়েছেন। তিনি আপসোস করেছেন। এসব বিখ্যাত ব্যক্তিদের এবং ধর্মের একচেটিয়া মদদ না পেলে হয়ত পুরুষরা যুগযুগ ধরে নারীদের প্রতি এতটা বৈষম্যেমূলক আঘাত হানতে পারত না।

নারীকে যে লিঙ্গের রাজনীতির দ্বারা বিভিন্ন ভাবে বঞ্চিত করা হয়েছে নারী গ্রন্থের “লৈঙ্গিক রাজনীতি” অংশে সে বিষয়টি হুমায়ুন আজাদ খোলামেলাভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি মনে করেন লৈঙ্গিক রাজনীতি পুরুষদের একটি সূক্ষ রাজনীতি। যা দ্বারা নারীকে বাধ্য করা হয় নিজেদেরকে মর্ষকামী করে তোলার জন্য। তিনি ‘মার্গারেট মিড’ এর নারী বিষয়ক গবেষণা গ্রন্থের রেফারেন্স দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন, আসলে আমাদের সমাজের নারীদের নারীত্ব বা মেয়েলিপনা সর্বজনীন নয়।

মার্গারেট মিড তার গ্রন্থে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানের নারীদেরকে নিয়ে গবেষণা করে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, অভ্যাস এবং প্রচলিত নিয়মের কারণেই নারীর সাথে পুরুষের এই লিঙ্গভেদ। তিনি প্রশান্ত মহাসাগরীয় আরাপেশদের ব্যাপারে বলেছেন, তারা নারী পুরুষ উভয়েই মেয়েলি ও মাতৃসুলভ এবং নিষ্ক্রিয়; এর কারণ তাদেরকে ছেলেবেলা থেকেই শেখানো হয় একে অন্যকে সহায়তা করতে। আবার মুন্ডগুমরদের নারী পুরুষ উভয়েই প্রচন্ড আক্রমনাত্মক ও পুরুষালী। চামবুলিদের ক্ষেত্রে আবার নারীরা আধিপত্যপরায়ন। পুরুষরা অধীনতাপরায়ন। হুমায়ুন আজাদ [দ্য ফ্রাইডান-১৯৬৩] গ্রন্থের রেফারেন্স দিয়েছেন। হুমায়ুন আজাদ এবং মার্গারেট মিড এর মতো আমার ঠিক একই মনে হয় – নারী পুরুষের সক্রিয়তা/নিষ্ক্রিয়তা ধ্রুব ও বিশ্বজনীন ব্যাপার নয়। যুগ যুগ ধরে চলে আসা মিথ, জৈবিক অপব্যখ্যা, নারী পুরুষের মধ্যে ধর্মীয়ভাবে বৈষম্যমূলক নিয়ম-কানুন এবং পুরুষতান্ত্রিক রাজনীতির প্রভাবই নারীর বর্তমান পরিণতির জন্য দায়ী।

আদিম সমাজের পৌরানিক উপাখ্যানের মিথগুলোই পরবর্তীতে হয়ে ওঠে নারীদের ব্যাপারে নৈতিক, সাহিত্যিক এমনকি বৈজ্ঞানিক রূপ। ‘প্যান্ডোরার সিন্দুক’ ও ‘বাইবেলের মানুষ পতনের কাহিনী’ – এই দুটি পৌরানিক উপাখ্যান পরবর্তীতে প্রভাবশালী ধর্মীয় মতবাদরূপে রুপান্তরিত হয়েছে। এই উপাখ্যানগুলোর আদিম ধারণাকে কেন্দ্র করে পরবর্তীতে আদিম ধার্মিকরা নারীকে সরাসরি দোষারোপ করার প্রয়াশ পেয়েছে। তারা মনে করে নারী অশুভ। কবি হেসিয়ডের মতে প্যান্ডোরাই প্রথম সূচনা করে কাম বা যৌনতার, এবং ওই কামের পাপেই পৃথিবীতে যত যুদ্ধ বিগ্রহ। হেসিয়ড মনে করেন, নারী জাতি এক মহামারী, যে মহামারীকে নিয়ে বাস করতে হচ্ছে পুরুষদের। হুমায়ুন আজাদ এসব ধারণাকে ঘৃণা করেছেন। কেবলমাত্র হুমায়ুন আজদই নয়, যেকোনো বিবেকসম্পন্ন মানুষই এই প্রাচীন ধারণাকে ঘৃণা করবে। অথচ একবিংশ শতাব্দিতে আমরা একই প্রাচীন এবং অসভ্য, অন্ধ মানুষের ধারণাগুলোকে ধারণ করে আমাদের নারী পুরুষের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করি। আমরা বর্বরোচিত পৌরানিক কাহিনীকে ধর্মীয় উদ্ধৃতি হিসেবে এখনও ব্যবহার করি।

পৌরানিক উপাখ্যানের মতো বাইবেলের মতে নারী হলো সমস্ত পাপের প্রাথমিক সূত্র। মুসলিমরা বলে কুরআন নারীর অধিকার ফিরিয়ে দিয়েছে। অথচ নারী যখন গাড়ি চালাতে চায় তখন তাদের আপত্তি শুরু হয়, নারীর ভোটাধিকার প্রশ্নবিদ্ধ ছিল কয়েক বছর আগেও। এমনকি এখনও অনেক দেশে নারীরা ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত। তাদের নিজেস্ব চিন্তাশক্তিকে মূল্যায়ন করা হয়না। তাদেরকে বেঁচে থাকার জন্য পুরুষদের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে চলতে হয়। এই কিছুদিন আগেও বাংলাদেশের নারীদেরকে স্কুলে, কলেজে যেতে দেখলে গ্রামের মুরুব্বীরা জাহান্নামের ভয় দেখাতেন এবং সুযোগ পেলেই সমস্ত নারীকে শরীয়া আইনের দোহাই দিয়ে ঘরে ঢোকানো এখনও তারা ফরজ কাজ বলে মৌলবাদীরা মনে করে।

ঠিক এমনি করেই হিন্দু সমাজের মৌলবাদী শ্রেণি মনে করতো নারী হলো পুরুষের সম্পত্তি, তাই ব্যক্তি পুরুষ মারা গেলে তার ব্যক্তিগত নারীকেও সহমরণে যেতে হবে। এমন পাশবিক ঘটনা ঘটত মিশরের ফারাওদের ক্ষেত্রেও। বঙ্কিমচন্দ্রের মতো সাহিত্যিক, সমাজহিতৈষী বলে খ্যাত ব্যক্তি মনে করতেন, নারীকে গৃহে আবদ্ধ রাখাই সমোচিত কাজ। রবীন্দ্রনাথের নায়িকারা যেন আবেগ আর প্রণয়পূর্ণতার জন্যই সৃষ্টি। হুমায়ুন আজাদ নানা উদ্ধৃতি দিয়ে বইটিতে এসব বিষয় তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন এবং তিনি শতভাগ সফল হয়েছেন। নারী বিষয়ে এত গভীর বিশ্লেষণাত্মক গ্রন্থ বাংলা সাহিত্যে তো নেই-ই, বিশ্বসাহিত্যেও হাতে গোনা।

হুমায়ুন আজাদ তাঁর নারী গ্রন্থের “দেবী ও দানবী” অংশে কুমারী নারীর সতিচ্ছেদ-এর বিষয়গুলোকে তুলে ধরেছেন। তিনি মালাবার উপকূলের নারীদের বিয়ের আগের রাতে সতিচ্ছেদ প্রথার এক জঘণ্য বর্ণনা দিয়েছেন। বিয়ের আগের রাতে নারীদের এই সতিচ্ছেদের দায়িত্ব ছিল ব্রাহ্মণদের। তারা সেই রাতটি বিবাহসম্ভাবা নারীটির সাথে কাটায়। এমন কি এ কাজের বিনিময়ে তারা মোটা অংকের পারিশ্রমিকও নিয়ে থাকে। দেখুন, কেবলমাত্র ধর্মের কারণে মানুষ এমন একটি জঘণ্য বিষয়কে অবশ্য কর্তব্য বলে মনে করত। ঠিক যেমনটি নারীরা মেনে নিত নিজেদের সহমরণের ক্ষেত্রেও। এক সময় যা ছিল অবশ্য কর্তব্য, তা আমরা এখন মনে করছি মহা অন্যায়, জঘন্য। আমার মনে হয় এমন অসংখ্য কুসংস্কার এখনও আমাদের মধ্যে আছে এবং এখন সেগুলোকে মনে করছি অবশ্য কর্তব্য, এক সময় গিয়ে ঐ কাজগুলোকেই মনে হবে জঘণ্য।

হুমায়ুন আজাদ নারী বিষয়ক জ্ঞানের সমুদ্রের গভীরে ডুব দিয়েছিলেন। নানান জাতি নানা সময় নারীদের প্রতি যে ধর্মীয় এবং সামাজিক প্রথা চাপিয়ে রেখেছিল তা তিনি ছাড়া আর কে তুলে আনতে পারেন! এসব সামাজিক প্রথা এবং ধর্মের কারণে স্বামী ছাড়াও নারীকে তাদের দেহদান করতে হত পুরোহিত বা সমাজপতিদেরকে। ব্যাবিলনের নারীদের বছরে একবার দেহদান করতে হতো মিলিট্টার মন্দিরে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন উপজাতির মেয়েদের কয়েক বছর দেহদানের জন্য পঠানো হতো আনাইটিসের মন্দিরে। পূর্বে বিবাহিত নারীদের ক্ষেত্রে এই নীতি থাকলেও পরবর্তীতে পুরোহিতগণ অবিবাহিত নারীদের ক্ষেত্রে দেহদানের বিষয়টি আরোপ করেন। হুমায়ুন আজাদ এই বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে [এ্যাঙ্গেলেস-১৮৮৪] গ্রন্থের উদ্বৃতি দিয়েছেন।

রুশো মনে করতেন, নারীরা বেঁচে থাকবে পুরুষের বিনোদনের জন্য। ঠিক এখনও অনেকে মনে করে নারীর জন্ম কেবল সন্তান জন্ম দেয়া ও তাদের লালনপালন করার জন্য এবং পুরুষদের মনোরঞ্জন এবং সংসার সামলানোর জন্য। হুমায়ুন আজাদ ঠিক এই প্রাচীন ধারণাকে আকড়ে থাকাকেই ঘৃণা করেছেন, তীব্র সমালোচনা করেছেন।

নারী গ্রন্থের “নারীর ঐতিহাসিক মহাপরাজয়” অংশে হুমায়ুন আজাদ কয়েকজন নারীবান্ধব মহামানবের কথা আলোকপাত করেছেন। তিনি জন স্টুয়ার্ট মিল এর নারী ভাবনা এবং ধারণা কিয়দাংশ আলোচনা করেছেন। জন স্টুয়ার্ট মিল উদার মানবতাবাদী দৃষ্টিকোন থেকে লিখেছিলেন, “নারী অধিনতা” নামে একটি প্রভাবশালী বই। মানবতাবাদী স্টুয়ার্ট মিল মনে করতেন, নারীজাতির অধীনতা ঘটেছে পুরুষের বল প্রয়োগের বিশ্বজনীন নীতিতে এবং তিনি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন যে, নারী জাতির অধীনতা দূর হবে প্রগতি ও নৈতিকতার অগ্রগতির ফলে।

এদিকে বিপ্লবী এ্যাঙ্গেলেস মনে করতেন সম্পত্তির ব্যক্তিমালিকানা ও নারীর অধীনতার ভিত্তির উপরই স্থাপিত পিতৃতন্ত্র। তাই পিতৃতন্ত্র ও পরিবার দাঁড়িয়ে আছে শোষণের ওপর; মানুষের একটি লিঙ্গ শোষণ করছে আরেকটি লিঙ্গকে, নারী শোষণের মহত্তর যন্ত্রটির নাম পিতৃতন্ত্র। তিনি অনুরক্ত ছিলেন বাখোফেনের “মাতৃ অধিকার” গ্রন্থে প্রস্তাবিত তত্ত্বের প্রতি। তিনি মনে করতেন সাম্যবাদ এবং সমবন্টন নীতিই নারীকে তার প্রকৃত অধিকার ফিরিয়ে দিতে পারে। হুমায়ুন আজাদ মনে করেন, নারী আর্থনীতিকভাবে শোষিত, তাই সব দিকেই শোষিত।

ভারতবর্ষে নারী অধিকারের জন্য যে দু’জন পুরুষ সক্রিয় ছিলেন, তারা হলেন “রাজা রামমোহন রায় এবং ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর”। এছাড়া অনেক নারীরাই নিজদের গল্প উপন্যাসে নিজেদের জন্য কান্নাকাটি করেছেন। বেগম রোকেয়া কৌশল অবলম্বনকারী নারী অধিকারের একচ্ছত্র সেবিকা ছিলেন। এছাড়া স্বর্ণকুমারী দেবী, শৈলবালা, অনুরূপা দেবী, নিরুপমা দেবী এরাও নিজেদেরকে নিয়ে লিখেছিলেন। কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক সমাজে তাদের কণ্ঠ প্রতিষ্ঠা পায়নি। এসব বিষয়গুলোর মাধ্যমে হুমায়ুন আজাদ তাঁর নারী গ্রন্থে নারীর প্রকৃত উত্থান-পতন, নারীর পিছিয়ে থাকার উৎসগুলো সম্পর্কে ব্যাপক আলোচনা করেছেন।

আধুনিক পরিবার দাঁড়িয়ে আছে নারীর প্রকাশ্য বা গোপন গার্হস্থ্য দাসত্বের ওপর। এঙ্গেলেস বলেছেন, পরিবারের মধ্যে স্বামী হচ্ছে বুর্জোয়া, স্ত্রী প্রলেতারিয়েত। কারণ পুরুষ উপার্জন করে। নারীর ক্ষমতা থাকা থাকা সত্যেও সামাজিক ও ধর্মীয় নানা অযুহাতে নারীকে এমনভাবে নিস্ক্রিয় রাখা হয়েছে যে তারা নিকৃষ্ট শ্রেণির অকর্মা এবং অপদার্থ।

নারী গ্রন্থের “পিতৃতন্ত্রের খড়গ : আইন বা বিধিবিধান” অংশে হুমায়ুন আজাদ নারী বিশ্লেষণের পথিকৃত সিমোন দ্য বোভ্যোয়ারের বক্তব্য তুলে ধরেছেন। সিমোন দ্যা বোভ্যোয়ার বলেছেন, নারীর প্রতি পুরুষ কর্তৃক যে বিধিমালা আরোপ করা হয়েছে, তা ক্রমান্বয়ে নীতির স্তরে উন্নিত করা হয়েছে। কারণ পুরুষ জানে তার তৈরি বিধি নারীর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না, নারী মেনে নেবে না এমন দন্ডাদেশ; তাই পুরুষ সেগুলোকে ঘোষণা করেছে ঐশী আইন বলে এবং পুরুষাধিপত্যকে প্রতিষ্ঠা করেছে নিজেদের স্বর্গীয় শাশ্বত অধিকার বলে।

হিন্দুমতে মনু বলেছেন, “পতির মৃত্যু হলে স্ত্রী পবিত্র পুষ্পফলমূল দিয়ে অল্পাহারে দেহক্ষয় করবে, তবু পরপুরুষের নাম করবে না। যদি পরপুরুষের নাম নেয় তবে রয়েছে চরম শাস্তি। অথচ এই আইন পুরুষের জন্য প্রযোজ্য নয়। ঠিক একই ক্ষেত্রে মনু বলেছেন, “ভার্যার মৃত্যু হলে দাহ ও অন্ত্যেষ্টিকৃয়া শেষ করে পুরুষ আবার বিয়ে ও অগ্ন্যাধ্যান করবে।” পুরুষ কামবিরহিত থাকবে না, থাকবে নারী। অবাক করার বিষয়ই যে, বৈষম্যের সূতিকাগার এই ধর্মগুলোর নিয়ম নীতি প্রতিষ্ঠার জন্য এখনও মানুষ যুদ্ধ করে, হত্যা করে।

হিন্দুবিধি পৃথিবীর একটি বিশেষ খণ্ডে সীমাবদ্ধ; কিন্তু যে দুটি আইনের জগতে সূর্য কখনো ডোবে না, সে দুটি হচ্ছে ‘ইংরেজি সাধারণ আইন’ ও রোমান আইন’, পরে যার নাম হয় ‘কোড নেপোলিয়ন’ বা ‘নেপলিয়ন বিধি’ দুটি বিধিই নারীর জন্য নৃশংস; দুটিরই প্রণেতা নারীবিদ্বেষীরা, যারা নরীকে দেখেছে প্রচন্ড ঘৃণার চোখে। এ দুটি বিধিতেই পিতৃতন্ত্রের মতো মাথার উপরে দাঁড়িয়ে আছে বাইবেল।

হুমায়ুন আজাদ নারী আইনের ক্ষেত্রে বাইবেল এবং কোরআন থেকে নানা উদ্ধৃদি তুলে ধরেছেন, যা প্রকৃতপক্ষেই নারীদের ক্ষেত্রে লৈঙ্গিক বিপর্যয়ের স্বাক্ষর বহন করে।

তিনি আলাদা আলাদাভাবে নারী বিশ্লেষক এবং নারীদের নিয়ে যারা ভেবেছিলেন তাদের বিশ্লেষণ বইটিতে তুলে ধরেছেন। তিনি রুশো, রাসকিন, রবীন্দ্রনাথ নামে একটি অধ্যয়ই বইটিতে তুলে ধরেছেন। নারী সম্পর্কে এসব মহামানবের ভাবনা চিন্তাকে তিনি ব্যাপকভাবে আলোচনা করেছেন। তিনি দান্তে, সেক্সপিয়রের কবিতায় নারী বিষয়ক ধারণাকে বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি লিও তলস্তয়ের নারী ভাবনাকেও বিশ্লেষণ করেছেন। প্রকৃত অর্থে নারী অধিকারের ক্ষেত্রে এই মহামানব ছিলেন ভয়ানক নিষ্ঠুর।

চল্লিশের দশকে ফ্রয়েডিয় নারী তত্ত্বের জনপ্রিয়করণের সময়কালে নারীবিষয়ক অসংখ্য বই লেখা হয়। যেসব বইয়ে নারীদেরকে যত হীন করা হয়েছে সেসব বই তত জনপ্রিয় হয়েছে। এসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মনোবিশ্লেষক ফর্ডনান্ড লুন্ডবার্গ ও সমাজতাত্ত্বিক মারিনিয়া ফার্নহ্যামের “আধুনিক নারী, বিলুপ্ত লিঙ্গ” নামের একটি চরম প্রতিক্রিয়াশীল বই, যা সাধারণ পাঠকের পাঠ্যপুস্তক হিসেবে তরুণ তরুণীদের প্রভাবিত করেছে। বইটিতে নারীদের আধুনিকায়নকে নিন্দা করা হয়েছে। মধ্যযুগের নারী আচরণকে বলা হয় শ্রেষ্ঠ। অথচ মধ্যযুগেই নারীরা ছিল সবচেয়ে হীন অবস্থায়। প্রগতির পথে বাধা সৃষ্টিকারী এসব গ্রন্থ সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় হবার কারণ হলো সাধারণ মানুষের মধ্যে ধর্মীয় প্রভাব এবং গোড়ামী। অথচ বিলেতে নারীর পক্ষে যে পুরুষ প্রথম লিখেছিলেন তিনি দার্শনিক উইলিয়াম টমসন; তার বই “মানবজাতির অর্ধেক, নারীদের আবেদন মানবজাতির অপর অর্ধেক, পুরুষদের দুরহঙ্কারের বিরুদ্ধে”। ১৮২৫ সালে এই বই প্রকাশের পর মানুষের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন উপহাসের পাত্র।

হুমায়ুন আজাদ তাঁর নারী গ্রন্থের “নারী- তার লিঙ্গ ও শরীর” অংশে নারীর শরীরকে ব্যবচ্ছেদ করেছেন। ঋতুস্রাব, ডিম্বানু-শুক্রানুর কার্যপ্রণালী, গর্ভাবস্থাসহ প্রজনন প্রক্রিয়ার ব্যাপক বিশ্লেষণ করেছেন বইটির এই অংশে। আমার মতে নারী অধিকার দাবির ক্ষেত্রে নারীর দেহ বিশ্লেষণের এই অধ্যায়টি ততটা হয়ত প্রয়োজন ছিলনা। তথাপিও এই অধ্যায়ের দ্বারা নারী সম্পর্কে কিছু অজানা তথ্য জানা সম্ভব হয়েছে।

“বালিকা” অধ্যায়ে বিভিন্ন সময়ে পৃথিবীতে নারীর খৎনা করার সময় যে পৈশাচিক অন্যায় করা হতো সেসব তুলে ধরা হয়েছে। পৃথিবীর বিভিন্ন জাতিগোত্রে, বিশেষ করে মুসলিমদের মধ্যে এই প্রবণতা লক্ষ্যণীয় ছিল। নারীর খৎনা বাধ্যতামূলক ছিল। খৎনা সফল করার জন্যে তারা গভীরভাবে কাটে বালিকার ভগাঙ্কুর, যাতে দেহে কামের একটি কণাও অবশিষ্ট না থাকে। খৎনার ফলে প্রবল রক্তক্ষরণ, জীবাণু সংক্রমন, মূত্ররন্ধ্র ফেড়ে যাওয়া, মূত্রথলে ও পায়ুদ্বার বিক্ষত হওয়ার মতো ঘটনা ঘটতো। সুদানের মেয়েদের খৎনা চলত জীবনব্যাপী।

নারী গ্রন্থের “নষ্টনীড়” অধ্যায়ে নারী ঋতুমতি হবার পর বিভিন্ন জাতি গোত্রের নারীর প্রতি নানান কার্যকলাপ তুলে ধরেছেন। কোনো কোনো দেশে নারী ঋতুমতি হলে সপ্তাহজুড়ে একটি ঘরে আটকে রাখা হয়। কোনো কোনো দেশে ঋতুমতি নারীকে অপবিত্র বলে ঘরের কোনো কিছু ছুঁতে দেয়া হয়না। কোনো কোনো দেশে নারীকে সূর্যের আলোয় আসতে দেয়া হয়না। হুমায়ুন আজাদ নারীর প্রতি এমন অসংখ্য বৈষম্যমূলক আচরণ তুলে ধরেছেন এই “নষ্টনীড়” অংশে। তিনি এই অংশে নারীর শারীরিক এবং জৈবিক অঙ্গের বৃদ্ধি এবং প্রশমনকে বর্ণনা করেছেন।

হুমায়ুন আজাদ তার নারী গ্রন্থটিতে “প্রেম ও কাম” “বিয়ে ও সংসার” “ধর্ষণ” নামে কয়েকটি অধ্যায় লিখেছেন। এছাড়া তিনি ১৭০০ শতাব্দির এক মহান নারীর কথা এই বইতে লিখেছেন। তিনি হলেন মেরি ওলস্টোনক্রাফট। মেরি ওলস্টোনক্রাফট তাঁর জীবনব্যাপী নারীদের জন্য লড়াই করে গিয়েছেন। কারণ তিনি একটি বৈষম্যমূলক পিতৃতান্ত্রিক কৃষক পরিবারে জন্মেছিলেন। তিনি ১৯ বছর বয়সে নিজ বাড়ি থেকে চিরতরে বের হয়ে যান। তারপর থেকে শুরু হয় তাঁর সংগ্রামী জীবন। জীবনের নানান সময় নানান জায়গায় তিনি কাজ করেছেন। অথচ বেগম রোকেয়ার মত তিনি কৌশলে করতেন পুরুষের চরিত্র ব্যবচ্ছেদ। তিনি প্রচলিত নিয়মের সরাসরি বিরোধিতা করতেন না। নারীবাদের ইতিহাসে এই মহান নারী সিমোন দ্য বোভ্যোয়ারের মতই চিরস্মরণীয়।

হুমায়ুন আজাদ নারী বইতে নারীর প্রতি বিভিন্ন বিখ্যাত বাঙ্গালীর আলোচনা সমালোচনাও তুলে ধরেছেন। রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বেগম রোকেয়া ছিলেন নারীর পক্ষের এক অমোঘ শক্তি। প্রচলিত ধারণা এবং ধর্মীয় গোড়ামীকে ভেঙে দিয়ে তারা চেয়েছিলেন নারীদেরকে কিছুটা হলেও মুক্তি দিতে। এবং তারা নিজেদের জায়গায় সফল ছিলেন।

বইটিতে বাঙ্গালী সম্পর্কে হুমায়ুন আজাদের একটি বিশেষ বিশ্লেষণ বলে রাখার মত, তা হলো, “বাঙলা ও বাঙালী এখনো এমনই আছে, ছাত্রজীবনেই তারা প্রগতিশীল পরে প্রতিক্রিয়াশীল”। তিনি অন্য এক জায়গায় বলেছেন, “আধুনিক কালের এক বড় ট্রাজেডি হচ্ছে একে চলতে হয় পুরোনো কালের বিধান দিয়ে।”

নারী গ্রন্থে একটি চমৎকৃত হওয়ার মত অধ্যায় হলো, “বঙ্গীয় ভদ্রমহিলা : উন্নত জাতের নারী উৎপাদন”। পাঠকদের নিশ্চই এই অধ্যায়টির জন্য হলেও বইটি পড়া উচিত। অধ্যায়টিতে বর্তমান সময়ের শিক্ষিত, অলস এবং স্বামীয় ঘাড়ে বসে খাওয়া আর সিরিয়াল দেখা’ই যাদের প্রিয় শখ এমন নারীদের ব্যাপারে অসাধারণ আলোচনা রয়েছে।

নারী গ্রন্থে “নারীবাদী সাহিত্য ও সমালোচনা” এবং “নারীদের উপন্যাসে নারীদের ভাবমূর্তি” নামে দু’টি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রয়েছে। যা এখানে বিস্তারিত আলোচনা করা সম্ভব নয়। এছাড়া সর্বশেষে রয়েছে “নারীদের ভবিষ্যৎ” নামে একটি অতি  ‍গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। যেখানে নারীমুক্তি এবং নারীদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ব্যাপক আলোচনা করা হয়েছে। হুমায়ুন আজাদ এই অধ্যায়ে বলেছেন, “কবে সমাজসংগঠন সম্পূর্ণ বদলাবে, তার জন্য যদি অপেক্ষা করতে হয় নারীকে, তাহলে হয়তো নারী সম্পূর্ণ ভুলে যাবে নিজের মুক্তির কথা। নারীমুক্তিকে সময়ের হাতে ছেড়ে দেয়া যায় না; সম্পূর্ণ সমাজসংগঠন বদলের অপেক্ষায়ও স্থগিত রাখা যায় না নারীর মুক্তি। কেননা সমাজসংগঠন নিজ গতিতে বদলালেই যে নারীরা মুক্তি পাবে তারও নিশ্চয়তা নেই।” অর্থাৎ হুমায়ুন আজাদ বলতে চেয়েছেন, নারীকে তার মুক্তির জন্য নিজেকেই লড়তে হবে। অন্যের এবং সমাজের দিকে তাকিয়ে থাকার সময় নেই আর। তিনি পুরুষতান্ত্রিক পরিবার বিলুপ্তির ব্যাপারেও পরোক্ষভাবে এই গ্রন্থে আলোকপাত করেছেন।

হুমায়ুন আজাদ নারীর ভবিষ্যৎ অংশে নারীমুক্তির পথ পরিষ্কার করার জন্য বলেছেন, “নারীকে একটি পেশা বেছে নিতেই হবে, আর সে পেশাটি কিছুতেই সংসার হবে না।” নারীকে আবার ঘরে ঢোকানোর জন্য যে মুসলিম মৌলবাদী শরিয়া আইন অসম্ভব তৎপর সে ধারণাও হুমায়ুন আজাদ দিয়েছেন তার এই গ্রন্থে। তিনি বলেছেন, নিজের ভবিষ্যতের জন্য নারীকে ত্যাগ করতে হবে পিতৃ ও পুরুষতন্ত্রের সমস্ত শিক্ষা দীক্ষা। ছেড়ে দিতে হবে সুমাতা, সুগৃহিনী, সতীর ধারণা, তাকে আয়ত্ত করতে হবে শিক্ষা, এবং গ্রহণ করতে হবে পেশা। তাকে হতে হবে অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন, তাকে প্রস্তুত থাকতে হবে সব ধরনের প্রতিক্রিয়াশীলতার সাথে লড়াইয়ের জন্যে। মনে রাখতে হবে, পুরুষের সাথে তার পার্থক্য মাত্র একটি ক্রোমেসোমের, এবং একটি ক্রোমেসোমের জন্য একজন প্রভূ ও অপরজন পরিচারিকা হয়ে উঠতে পারে না।

তিনি নারী গ্রন্থে বলেছেন, “নারীর গর্ভধারণ একান্ত পাশবিক কাজ”। বিষয়টি আমি পজেটিভলি দেখিনি  ব্যক্তিগতভাবে। কারণ এই তত্ত্ব মানতে গেলে মানুষ তার অস্তিত্ব বিলোপের দিকে ধাবিত হবে। তবে তাঁর মতে আমূল নারীবাদীরা মনে করেন মানবপ্রজাতিকে টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব নারীর নয়। যদি সত্যিকার অর্থেই বিজ্ঞান কোনোদিন এর বিকল্প পথ খুঁজে পায়, হয়ত তখনই হবে নারীর পরিপূর্ণ মুক্তি। তবে এর আদৌ প্রয়োজন আছে কিনা পাঠকরা তাদের চিন্তাশক্তি কাজে লাগিয়ে বিশ্লেষণ করে দেখবেন।

 

 

 

Leave a Reply