বাকস্বাধীনতা ও নারীবাদ
ইমতিয়াজ মাহমুদ ।। আমরা নিয়মিতই একটা কথা বলি যে নারীকে লড়তে হয় দুইটা ফ্রন্টে যুগপৎ – একটা ফ্রন্ট হচ্ছে নারী পুরুষ সকলের জন্যে গণতন্ত্র স্বাধীনতা ও সমতার লড়াই, আর দ্বিতীয় ফ্রন্টটা হচ্ছে নারীর নিজস্ব লড়াই, নারী ও পুরুষের মধ্যে সমতার লড়াই। এইখানে কেউ প্রশ্ন করতে পারেন, নারীকে যদি সমতার অধিকারের জন্যেই লড়তে হয়, তাইলে আবার আলাদা করে সকলের মুক্তির জন্যে যে লড়াই সেখানে অংশগ্রহণ করার দরকারটা কী? এর একবাক্যের উত্তর হচ্ছে, নারী পুরুষ দুই-ই যদি বন্দি থাকে পুঁজির শৃঙ্খলে, তাইলে নারী পুরুষের সমতা থাকলেই কী আর না থাকলেই কী? বন্দির তো কোন লিবার্টিই থাকে না, একদল বন্দির মধ্যে সমতা থাকলে সেটা তো হবে ‘সকল দাস সমান’। এইজন্যেই নারী ও পুরুষ সবাইকেই লড়তে হয় পুঁজির বিরুদ্ধে, বিদ্যমান প্রথা প্রতিষ্ঠান এইসবের বিরুদ্ধে- চুড়ান্তভাবে পচে যাওয়া এই পুরনো সমাজ কাঠামো ভাঙার জন্যে। তাই বলে নারীর নিজের অধিকারের লড়াইটা থেকে তো পেছনে হটতে পারবেন না, কেননা নয়া যে সমাজটা হবে, সেই সমাজটিও যদি আরেকটা পিতৃতান্ত্রিক সমাজই হয় – নারী ও পুরুষের মধ্যে যদি সমতা নিশ্চিত না হয় – তাইলে নারীর কী লাভ? এইজন্যে নারীকে লড়তে হয় দুই দুইটা ফ্রন্টে, যুগপৎ।
সমাজ বদলের সংগ্রাম একটা দীর্ঘ সংগ্রাম। এই দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় নারীকে লড়তে হয় প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে। এই লড়াইটা একদিকে যেমন নারীর মুক্তির লড়াই, সেই সাথে গণতন্ত্রের লড়াই এবং অনিবার্যভাবেই বাক ও চিন্তার স্বাধীনতার লড়াই। কেননা বাক ও চিন্তার স্বাধীনতা হচ্ছে মানুষের সকল স্বাধীনতার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্বাধীনতা বা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধিকার, সকল সংগ্রামের প্রথমেই আসে বাক ও চিন্তার স্বাধীনতার প্রসঙ্গটি। নারীমুক্তির লড়াইতেও সেজন্যে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে থাকে বাক ও চিন্তার স্বাধীনতার সংগ্রাম। বাক ও চিন্তার স্বাধীনতাকে উপেক্ষা করে নারীর মুক্তির সংগ্রাম হবে না, সেটা সম্ভব নয়। কেন? কয়েকটা কারণের কথা বলি।
প্রথমত, পিতৃতান্ত্রিক সমাজ সবসময়ই চেষ্টা করেছে নারীর কণ্ঠ রুদ্ধ করে রাখতে। পিতৃতন্ত্র সবসময়ই একটা সাংস্কৃতিক আধিপত্য তৈরি করে রাখে যাতে করে সমাজের সকলের মনে একটা পূর্বানুমান বিরাজ করে যে বিদ্যমান সমাজের যে কাঠামো রয়েছে সেটাই স্বাভাবিক। কল্পনা করুন আজ থেকে প্রায় দেড়শ বছর আগে যখন বেগম রোকেয়ার জন্ম হয় তখন সমাজের কথিত ‘স্বাভাবিক’ রূপ কী ছিল? নারী থাকবে অবরুদ্ধ এটাই ছিল সমাজের কথিত স্বাভাবিক রূপ। নারীর কথা কেউ শুনতে পারবে না, ভদ্র ঘরের মুসলিম নারী কাগজে লিখবেন না, যদিও বা লেখেন সেটা হতে পারে খুব বেশি হলে ফুল তোলা বা উল বোনার প্যাটার্ন নিয়ে লেখা। একজন নারী যদি অধিকারের কথা বলতো, তাইলে সমাজ হায় হায় করে উঠত – বলতো যে আরে এই দুষ্ট নারী এ তো সমাজের ‘ফেব্রিক’ নষ্ট করে ফেলবে, সমাজ সংসারে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে ইত্যাদি। এইজন্যে বেগম রোকেয়া যখন লেখা শুরু করলেন নারীর অধিকারের কথা, তাঁকে সমাজ গালি দিয়েছে। গত বছর পাঁচই আগস্টে রোকেয়ার ম্যুরালে ওরা যেসব গালি লিখেছে তাঁর চেয়ে পচা পচা সব গালি। এর মানে হচ্ছে যে, বাক ও চিন্তার স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এটা নারীর সংগ্রামের অংশ শুধু নয়, এক অর্থে পূর্বশর্তও বটে।
দ্বিতীয়ত, যে সমাজে কণ্ঠ রুদ্ধ করা হয়, সেই সমাজে পুরুষের কণ্ঠ যতটুকু না রুদ্ধ করা হয় নারীর কণ্ঠ রুদ্ধ করা হয় তার চেয়ে বেশি। দেখবেন যে আজও কোন সমাজে যখন মানুষের কথা বলার বা মত প্রকাশের অধিকারের উপর খড়গ নেমে আসে, তখন পুরুষের অধিকার যতটা রুদ্ধ হয় নারী কণ্ঠ রুদ্ধ হয় তার চেয়ে বেশি। আপনি যদি রক্ষণশীল মুসলিমপ্রধান দেশগুলির দিকে তাকান – পাকিস্তান, সৌদি আরব বা এরকম অন্য যেসব দেশ আছে, সেখানে পুরুষের অধিকার যতটুকু সীমিত করা হোক না কেন, নারী অধিকার বিঘ্নিত হয়ে তার চেয়ে বেশি। এইজন্যে বাক ও চিন্তার স্বাধীনতার প্রয়োজন পুরুষের চেয়ে নারীর জন্যে বেশী। এইখানেও বাকস্বাধীনতার লড়াইটা নারীকে লড়তে হয়ে দুই প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে – একটা তো হচ্ছে রাষ্ট্রের যে রক্ষণশীল আদর্শ সেটার বিরুদ্ধে, এইটা লড়তে হয় নারী ও পুরুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে; আর দ্বিতীয়টা হচ্ছে নারীর নিজের কথা বলার অধিকারের জন্যে যেখানে রাষ্ট্র ও পুরুষ দুই পক্ষই থাকে নারীর বিপক্ষে শক্ত প্রতিপক্ষ হয়ে।
তৃতীয় কারণ যেটা, নারীর লড়াইটা তো প্রাথমিকভাবে পিতৃতন্ত্রের বিরুদ্ধেই বটে, কিন্তু চুড়ান্ত বিচারে নারীর লড়াইটা পুঁজিবাদ তথা বিদ্যমান সমাজ কাঠামোর বিরুদ্ধেও বটে। সেই সাথে প্রচলিত সব ধর্মবিশ্বাসের বিরুদ্ধেও। এদের পারস্পরিক সম্পর্কটা দেখলে দেখবেন, পুঁজিবাদ তথা বিদ্যমান সমাজ কাঠামোকে ধরে রাখাই হচ্ছে পিতৃতন্ত্রের কাজ, আর প্রচলিত যেসব ধর্মবিশ্বাস আছে, সেগুলির কাজ হচ্ছে পুঁজিবাদ ও পিতৃতন্ত্র এই দুইকে রক্ষা করা বা বজায় রাখা। এই লড়াইয়ে তো নারীর জন্যে নারীদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক, সমাজ সম্পর্কে আলোচনা, সচেতনতা তৈরি করা, সংগঠন ইত্যাদি তৈরি করা এবং বিদ্যমান কাঠামো সম্পর্কে সুস্পষ্ট বোঝাপড়া ছাড়া সম্ভব নয়। আর কথা বলার স্বাধীনতা যদি না থাকে তাইলে আপনি কিভাবে এইসব করবেন। এছাড়া আছে অন্য গ্রুপ বা গোষ্ঠীসমুহের যোগাযোগ ও সমন্বয়। এই গ্রুপ বা গোষ্ঠীগুলির মধ্যে আছে এলজিবিটিকিউ, আদিবাসী বা জাতিগত ও অন্যান্য সংখ্যালঘু যারা – ওরা। এদের সকলের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা, সকলের মধ্যে সাংগঠনিক কাঠামো ইত্যাদি তৈরি করা – এগুলি তো আর গুপ্তদল ক’রে করা সম্ভব নয়। আপনাকে লড়তে হবে বাকস্বাধীনতার জন্যেও।
এর মানে যেটা হয়, নারীর সংগ্রাম একদিকে যেমন স্বতন্ত্র ও নিজস্ব একটি লড়াই, সেইসাথে আবার সমাজের সকল বঞ্চিত নিপীড়িত শোষিত মানুষের সাথে একসাথে সমন্বিত একটি লড়াইও বটে। এইজন্যে বাক ও চিন্তার স্বাধীনতার দাবিটি আদায়ের জন্যে নারীকে সমাজের অন্য সকলের সাথে মিলেই লড়তে হয়। নারীবাদীদের কেউ যদি নিজেদেরকে অরাজনৈতিক বা বিরাজনৈতিক মনে করে মানুষের এই অধিকারটি – বাক ও চিন্তার নিরঙ্কুশ অধিকারটি – এইটা আদায়ের লড়াই থেকে নিজেদের বিরত রাখে, ওরা কার্যত নারীমুক্তির লড়াই থেকেই যেন নিজেদের বিরত রাখলো।
[ফেমিনিস্ট ফ্যাক্টরে প্রকাশিত কলাম লেখকের নিজস্ব বক্তব্য]

