March 7, 2026
ফিচার ২মুক্তমত

এমন দেশ চাইনি!

চেনা অপরিচিতা ।। দেশের একজন সাধারন নাগরিক হিসেবে কিছু কথা জানাবার জন্য ছটফট করছি চব্বিশের পাঁচই আগস্ট পরবর্তী সময় থেকে। আমি কোনো রাজনৈতিক বিশ্লেষক নই, নই কোনো সাংবাদিক, আইনজ্ঞ বা বিশাল কোনো ব্যক্তিত্ব। আমি সামান্য একজন চাকুরিজীবী, এমন একটি প্রতিষ্ঠানে যেখানে সরকারের সমালোচনা করার লিখিত বা অলিখিত এখতিয়ার কারোরই নেই। জীবিকার তাগিদে, পরিবারের সুরক্ষায় আমার মতো অনেকেই চুপ করে আছেন। কেন? এই প্রশ্নের উত্তর হয়ত অধিকাংশের জানা। তাও বলছি।

বিগত সরকার আমলে সামাজিক মাধ্যমে আসংখ্য ইস্যু নিয়ে সরকারের সমালোচনা করতে খুব একটা ভাবতে হত না। অথচ এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় (নাকি অসময়!) একটি টু শব্দ করা সম্ভব হচ্ছে না। আওয়ামী লীগের অসংখ্য কর্মী ঘরছাড়া। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ যারা লালন করেন তাদের  চাকুরি, জীবন, সামাজিক অবস্থান, নিরাপত্তা, সব কিছুই ঝুঁকির মুখে। যারাই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সরব হচ্ছেন তাদেরকেই জেলে ভরা হচ্ছে। নিজের জীবনের ঝুঁকি হয়ত নেওয়া যায়। কিন্তু যারা আপনার সাথে যুক্ত, তাদের অসুবিধা, অনিরাপত্তার দায় বা ঝুঁকি নেওয়া কি উচিৎ? কিন্তু দেশও তো মা। তার এই দুঃসময়ে কি প্রতিবাদটুকুও করতে পারব না?

চব্বিশের জুলাইতে যখন ‘কোটা না মেধা’ নিয়ে দেশ উত্তাল তখন শুধু ভেবেছি একটা সুন্দর সামাধান এলে দেশ বাঁচবে। সেই সমাধান এলো। হাইকোর্টের রায়ের প্রেক্ষিতে আন্দোলনরত ছাত্রদের দাবি জয়যুক্ত হলো। ভাবলাম এর পর তো আন্দোলনের কোনো বিষয় থাকতে পারে না। কিন্তু এর মধ্যে অনেক মানুষ মারা গেল। সরকারের আচরণে হতবাক হয়ে ভাবলাম, এরকম কেন করছে? এতটা দানবীয় পরিস্থিতি চোখের সামনে একটার পর একটা ঘটছিল যে বুঝতে পারছিলাম না সরকার বা সরকারপক্ষীয় লোকজন এত বালখিল্য কথা বলছে কিভাবে! তারপর হাসিনা সরকারকে সরে যেতে এক দফা আন্দোলন শুরু হলো। ভাংচুর, পুলিশ, থানা পুড়িয়ে দেওয়া, সাধারন মানুষের জীবন, নিরাপত্তা বিপন্ন হয় এমন অসংখ্য ঘটনা ঘটতে থাকলো। সেসময় অনেকের মত আমিও ভেবেছিলাম, এই দীর্ঘ রেজিম চেঞ্জ হলে হয়ত নতুন একটা দিক পাবে দেশ। সবাই হাঁফ ছেড়ে বাঁচবে। এই ভয়াবহ পরিস্থিতির অবসান হোক।

স্বাভাবিক একটা দেশ চেয়েছিলাম। সবার কথা শুনে মনে হচ্ছিল আওয়ামী তোষণমুক্ত হয়ে আমরা আরও সুন্দর একটা পথে যাত্রা করতে পারি। পরিবর্তন মানে সম্ভাবনা। আর এই পরিবর্তন ভালো কিছু বয়ে আনতে পারে। কিন্তু ৫ আগস্ট আকস্মিক পট পরিবর্তনের পর ভয়াবহ অরাজকতা দেখতে পেলাম। গণভবন লুট, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বেগম রোকেয়াসহ অনেক প্রথিতযশা ব্যক্তিত্বের প্রতিকৃতি, ভাস্কর্য বঅঙ্গচুর কালিমা লেপন, মূত্রত্যাগ, বাড়ি, রাজনৈতিক অফিস, দোকান ভাঙচুর , ডাকাতি, লুটপাট, মুক্তিযোদ্ধাদের অপমান, নারী প্রধানমন্ত্রীর অন্তর্বাস প্রদর্শন, একাত্তরের স্মৃতিবিজড়িত বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বর বাড়ি গুড়িয়ে দিয়ে পৈশাচিক উল্লাস… কি দেখিনি বা সহ্য করিনি!

স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তি এত প্রবল আসুরিক শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পরবে ভাবতেও পারিনি। এতটা ঘৃণা, কূপমণ্ডূকতা, ধর্মের যথেচ্ছ ব্যবহার মানুষের মৌলিক অধিকারেও থাবা বসাবে! সত্যি, কল্পনার অতীত ছিল। ভিন্ন ধর্মের ভিন্ন মতের মানুষ হত্যা, ধর্ষণ, মানুষের কর্ম বা অর্থ সংস্থানের ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর ক্ষেত্র, নারীদের সামাজিক অনিরাপত্তা, কট্টরপন্থীদের অযাচিতভাবে সাধারণ মানুষদের কোণঠাসা করার প্রবণতা, সবচেয়ে বড় বিষয় হল বাকস্বাধীনতার চরম পরাজয়।

এখন বাকস্বাধীনতা বলতে যদি গালাগালি করতে পারার অধিকার চান স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তি হয়ে, সে অধিকার পূর্ণ মাত্রায় আপনি পাবেন। বয়োজ্যেষ্ঠ মুক্তিযোদ্ধাকে চরম অশ্রাব্য গালি দিন। আপনার সামাজিক খ্যাতি হবে আকাশচুম্বী। আপনি আখ্যায়িত হবেন মহান বিপ্লবী হিসেবে। কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের দ্রোহের কবি। আপনি হবেন তাঁর সমপর্যায়ের। সে যাই হোক…।

আর কোনো কিছু চাইলে স্কুল কলেজের কিছু ছেলেপেলে নিয়ে হাতে কিছু কিরিচ দা বটি ধরিয়ে ছিনিয়ে নিন, অর্থ, পদত্যাগ বা যা মন চায়। পুলিশ আর্মি আপনার কিচ্ছু বাঁকা করার সামর্থ্য রাখে না। তাই এই মবের রাজত্বে মানুষ সবসময় নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। কে বিচার করবে? আপনার পক্ষে মব নেই তো আপনি অকার্যকর।

আর্থিক সামর্থ্য আছে এরকম অনেকেই দেশত্যাগ করেছে। কিন্তু সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ কোথায় যাবে? তারা তাই অভাবের তাড়নায় মরছে, নয় জড়িয়ে পড়ছে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে।

এরকম দেশ হবে আমাদের, কেউ কী কখনো স্বপ্নেও ভেবেছিল!

বিশ্ব রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এই মুহূর্তে উত্তপ্ত। প্রত্যেকটা দিন একটা চাপা ভয়, উৎকণ্ঠায় কাটে। আসন্ন নির্বাচনে মনোনয়নপ্রাপ্ত অধিকাংশ প্রার্থী স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তি। এরা নারীর ক্ষমতায়ন, গণতন্ত্র, মুক্তচিন্তা, আমাদের ইতিহাস, সংবিধান, সংস্কৃতি, এসবে বিশ্বাসী নয়। তাদের কথায় ভালোবাসা নেই। ঘৃণা, লোভ, মিথ্যে অভিনয়, হাস্যকর কাজ আর ষ্টেটমেন্টে তারা ভাইরাল। তবু তাদের মেকি আত্মবিশ্বাসপূর্ণ কথায় অল্পশিক্ষিত মানুষ ভাবে এরাই হয়ত সত্যের বাহক। এরা ব্যবহৃত হয় সেই অশিক্ষিত বৌটির মত যার স্বামী  তার সাথে সব দিক দিয়ে প্রতারণা করার পরও এরা ভাবে সে আসলে তাকেই ভালবাসে।

আমরা নিজেরা কেউ সত্য অনুসন্ধান করতে চাই না। হয়ত আমিও জেনজি প্রজন্ম হলে জানার, পড়ার আগ্রহ পেতাম না। ভাগ্যিস, আমার বাবা মা মুক্তিযুদ্ধ দেখেছেন, সহায়তা করেছেন, বইপত্র কিছু হলেও পড়েছি। তাই সত্যটা জানি। আমাদের দেশে সবকিছুর অধিকার প্রাপ্তিতে আন্দোলন চলে। কিন্তু একটা ভাল লাইব্রেরি, একটা পাঠাভ্যাস, প্রশ্ন করার অধিকার নিয়ে কোন আন্দোলন দেখি না।  আমার কথা অনেকের কাছে অসাড় লাগবে। এই তথ্য প্রযুক্তির যুগে পাঠ্যক্রমের বাইরে বই নিয়ে বসার মত মানুষ হাতে গোনা। কিন্তু আমরা নিজেরা যদি সঠিক ইতিহাসের পাতা খুঁজে জেনে নেওয়ার আগ্রহটুকু রাখতাম তাহলে আমাদের নিয়ে কেউ খেলতে পারতো না।

রাজনৈতিক মতানৈক্য থাকতেই পারে। যেমন আমি কখনোই বুঝব না কিছু স্বার্থপর ক্ষমতা লোভী পুরুষ বাদে নারীরা কোন রুচিতে জামায়াত এর মতো দল করে। যেই জামায়াত স্বাধীনতার সময় পাকিস্তানীদের বাঙালি মেয়েদের ধরে এনে সাপ্লাই দিত! আমি এখনকার লালবদরদেরও বুঝিনা। এরা একই সাথে বাঙালি সংস্কৃতি চর্চা করে, ভাষার অক্ষুণ্ণতা বজায় রাখতে চায়, আবার আতিফ আসলামের কন্সার্ট, হানিয়া আমীরের সাক্ষাৎকার দেখে, যে রাষ্ট্র আজ পর্যন্ত তাঁদের কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চায়নি তাদের আগ বাড়িয়ে নিজেদের পশ্চাৎদেশ এগিয়ে দেয় বলাৎকার হওয়ার জন্য আর বন্ধুরাষ্ট্রকে শত্রু ভাবে। তারা গালিবাজকে আইডল ভাবে। এই লালবদররা সোজা ভাষায় – না ঘোড়া না গাধা। একেবারে খচ্চর। কনফিউজড।

অসাংবিধানিক একটি সরকার ব্যবস্থায় দেশের স্বার্থ রক্ষিত হলে আমিও ভোটকেন্দ্রে যেতাম। তবে পছন্দের কোনো প্রার্থী আমার নির্বাচনী এলাকায় নেই। তাই ভোট দেওয়ার প্রশ্ন আসে না। তবে আপনারা যারা ভোট দিতে যাচ্ছে তারা নিজ নিজ প্রার্থী আর দলের ইতিহাস নিজে খুঁজে জেনে নেবেন।

শেষ করি কিছু পরিসংখ্যান দিয়ে। জানি কারো কিছুই যাবে আসবে না। তবু দেখুন, দেশের পরিস্থিতি আসলে কতটা শোচনীয়।

জাতিসংঘের প্রাথমিক প্রতিবেদন এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, জুলাই থেকে ৫ আগস্টের সরকার পতন পর্যন্ত এবং তার পরবর্তী কয়েক দিনের সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা ১,৪০০ জনের বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একটি তালিকায় প্রাথমিকভাবে ১,০০০ জনের অধিক নিহতের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছিল। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের মাসিক প্রতিবেদন ২০২৫ অনুযায়ী ২০২৫ এর জানুয়ারি-আগস্ট ধর্ষণের শিকার হয় ৩৬৪ জন। বাস্তবতায় সংখ্যা নিশ্চয়ই এর কম হবে না।

দেশের উত্তরণ কীভাবে হবে জানিনা। আমরা যেন কীট পতঙ্গের মত বেঁচে আছি। সবাই নিরাপদে থাকতে চেষ্টা করুন। একদিন ভোর হবে নিশ্চয়ই!

 

[ফেমিনিস্ট ফ্যাক্টরে প্রকাশিত মুক্তমত লেখকের নিজস্ব বক্তব্য]

Leave a Reply