September 24, 2026
ফিচার ১সাক্ষাৎকার

‘নিজের যৌনতা ও যৌন আকর্ষণ আমরা ক্রমাগত দমন করি’

২০১৮ সালের শুরুর দিকে, #MeToo আন্দোলন নিয়ে যখন বেশ জোরালোভাবে আলোচনা চলছিল, তখন আমিয়া শ্রীনিবাসন London Review of Books-এ তাঁর প্রবন্ধ “Does Anyone Have the Right to Sex?” প্রকাশ করেন। প্রবন্ধটি প্রকাশের পর অনেকের মধ্যে নানা ধরনের তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। একই সঙ্গে এই লেখার মাধ্যমে পৃথিবী একটি বিখ্যাত বাক্যও পায়: “Sex is not a sandwich.” অর্থাৎ, “যৌনতা কোনো স্যান্ডউইচ নয়।”

শ্রীনিবাসন ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় এবং পরে অক্সফোর্ডে দর্শন নিয়ে পড়াশোনা করেন। এরপর তিনি অক্সফোর্ডের বিশ্লেষণী দর্শনের দীর্ঘদিনের পুরুষ-প্রধান জগতে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেন। ২০১৯ সালে তিনি অক্সফোর্ডে Social and Political Theory-এর Chichele Chair পদে নিযুক্ত হন। এই পদে এর আগে ছিলেন বিখ্যাত দার্শনিক Isaiah Berlin। শ্রীনিবাসনই এই পদে বসা প্রথম নারী, প্রথম বর্ণগত সংখ্যালঘু ব্যক্তি এবং সবচেয়ে কম বয়সী ব্যক্তি।

দ্য প্যারিস রিভিউ পত্রিকায় আমিয়া শ্রীনিবাসনের এ সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ হয় ২০২১ সালে। ফেমিনিস্ট ফ্যাক্টরের পাঠকদের জন্য সাক্ষাৎকারটি বাংলায় অনুবাদ করা হল। 

 

প্রশ্ন: আপনি কবে থেকে নিজেকে নারীবাদী মনে করতে শুরু করলেন?

শ্রীনিবাসন: ছোটবেলায় নারীবাদের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্কই ছিল না। স্কুলে একজন ফরাসি শিক্ষিকার কথা আমার খুব স্পষ্ট মনে আছে। সম্ভবত তখন আমি ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়তাম। তিনি একদিন জিজ্ঞেস করলেন, আমাদের মধ্যে কে কে নিজেকে নারীবাদী মনে করি।

আমরা তাঁর দিকে এমনভাবে তাকিয়েছিলাম, যেন তিনি জিজ্ঞেস করছেন, “তোমাদের মধ্যে কে কে নিজেদের ‘‘লেভেলার’ বলে মনে করো?” অর্থাৎ ইতিহাসের কোনো পুরোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠীর নাম বলছেন, যা আমাদের কাছে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক এবং একই সঙ্গে ভীষণ আকর্ষণহীন মনে হয়েছিল।

এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়, এটা বলতে আমার এখন ভীষণ লজ্জা লাগে, মূলধারার মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যে নারীবাদকে খুব একটা বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে করা হতো না।

তাই নারীবাদ আমার জীবনে একেবারে পড়াশোনার বাইরের একটি বিষয় হিসেবে এসেছিল। অক্সফোর্ডে গ্র্যাজুয়েট ছাত্র হিসেবে পড়ার সময় আমি প্রথম নারীবাদের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হই।

আসলে ঘটনাটা খুব সাধারণ ছিল। এক গ্রীষ্মে আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু, যে তখন NYU-তে দর্শনের গ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থী, আমাকে The Second Sex বইটির একটি কপি দিল। আমার মনে হয়, তার কাছে The Feminine Mystique-এরও একটি কপি ছিল। সে শুধু বলেছিল, “দেখো, আমার মনে হয় এবার আমাদের এই বইগুলো পড়ার সময় হয়েছে।”

এর কিছুদিন পর আমি নারীবাদী দর্শন নিয়ে একটি পাঠচক্র শুরু করি। সবচেয়ে মজার ব্যাপার ছিল, এর মাধ্যমে এমন অনেক শিক্ষার্থীও সামনে চলে এসেছিল, যাদের দেখে আগে মনে হতো তারা এসব বিষয়ে একেবারেই আগ্রহী নয়।

আমরা সবাই তখন জ্ঞানতত্ত্ব, অধিবিদ্যা এবং দর্শনের ভাষা নিয়ে গবেষণাপত্র লিখছিলাম। বাইরে থেকে যাদের একেবারে মূলধারার বিশ্লেষণী দার্শনিক মনে হতো, তাদের ভেতরেও দেখা গেল গোপনে অন্যরকম, প্রচলিত ধারণার বিরোধী কিছু চিন্তা ও আকাঙ্ক্ষা রয়েছে।

প্রশ্ন: তাহলে আপনি যে প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশের মধ্যে ছিলেন, তার বিরুদ্ধে এক ধরনের বিদ্রোহও কি এর মধ্যে ছিল?

শ্রীনিবাসন: আমার মনে হয়, এটা ছিল এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক হতাশার প্রকাশ। আমি খুব সংকীর্ণ ধরনের বিশ্লেষণী দর্শনের মধ্যে কাজ করছিলাম।

একদিকে, সেখানে স্পষ্টতা এবং নির্ভুলতার ওপর যে গুরুত্ব দেওয়া হয়, সেটা আমার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছিল এবং এর জন্য আমি কৃতজ্ঞ। কিন্তু অন্যদিকে, একই জিনিস আমার কাছে দমবন্ধ করা মনে হচ্ছিল।

আমার ভয় হচ্ছিল, আমার মস্তিষ্কের যে অংশগুলোকে আমি সবচেয়ে বেশি মূল্য দিই, যে অংশ সাহিত্য, কবিতা এবং ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত, সেগুলো যেন ধীরে ধীরে বাদ পড়ে যাচ্ছে।

তাই এক অর্থে এটা ছিল আমি যে বিশ্লেষণী দর্শনের প্রশিক্ষণ পাচ্ছিলাম, তার বিরুদ্ধে একটি প্রতিক্রিয়া।

আরেক অর্থেও এটা ছিল প্রতিক্রিয়া। দর্শন এমন একটি বিষয়, যেখানে পুরুষের আধিপত্য খুব বেশি। আর এর ফলে যে ধরনের সমস্যা তৈরি হওয়ার কথা, সেগুলো তো আছেই। তার বাইরেও এমন কিছু বিষয় আছে, যেগুলো সেই পরিবেশের ভেতরে না থাকলে ঠিকভাবে ব্যাখ্যা করাও কঠিন।

Michèle Le Dœuff-এর Hipparchia’s Choice বইয়ে একটি অসাধারণ কথা আছে। আমি হয়তো ঠিকভাবে উদ্ধৃত করতে পারব না, কিন্তু কথাটা মোটামুটি এমন:

“আপনি যদি একজন নারী এবং একই সঙ্গে একজন দার্শনিক হন, তাহলে আপনার সঙ্গে কী ঘটছে, সেটা বোঝার জন্য নারীবাদ থাকা খুবই উপকারী।”

প্রশ্ন: আপনি যে একাডেমিয়ার বাইরে লেখালেখি করেন, সেটাকে কি আপনার দার্শনিক কাজের সঙ্গে যুক্ত বলে মনে করেন? আর দর্শন ও রাজনীতির সম্পর্ককে আপনি কীভাবে দেখেন?

শ্রীনিবাসন: দর্শন কী এবং রাজনৈতিক তত্ত্ব কী – এ দুটোকে আমাদের আরও বিস্তৃতভাবে বোঝা উচিত।

অনেক গুরুত্বপূর্ণ নারীবাদী লেখা একই সঙ্গে দর্শন এবং রাজনৈতিক তত্ত্ব হিসেবে পড়া যায়। আমি আমার শিক্ষার্থীদেরও এই বিষয়টি বোঝানোর চেষ্টা করি।

উদাহরণ হিসেবে The Dialectic of Sex পড়া অনেকটা The Republic পড়ার মতো। দুটো বইই একই সঙ্গে উত্তেজনাপূর্ণ, অদ্ভুত, প্রচলিত নিয়ম ভাঙা, সমস্যাপূর্ণ, খুবই আকর্ষণীয় এবং কল্পনাপ্রবণ। এগুলো এমন লেখা, যেগুলো নিয়ে গভীরভাবে ভাবা যায়।

আমি খুব বেশি সময় ব্যয় করি না এটা ভেবে যে আমি যা করছি সেটা দর্শন কি না। আমি যে বিষয়গুলোতে আগ্রহী, সেগুলো নিয়েই লিখি।

আমার মতো সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে আগ্রহী পেশাদার দার্শনিকদের কেউ কেউ সবসময় বাস্তব সমাজ ও রাজনীতির সমস্যাগুলো নিয়ে কাজ করেন। কিন্তু আমি একই সঙ্গে এমন অনেক একেবারেই অপ্রয়োজনীয় বিষয় নিয়েও প্রচুর সময় কাটাই।

আমার দুজন শিক্ষক ছিলেন, যারা খুব বিমূর্ত ধরনের জ্ঞানতত্ত্ব, অধিবিদ্যা, ভাষার দর্শন এবং যুক্তিবিদ্যা নিয়ে কাজ করতেন। তাঁদের কাজকে রাজনৈতিকভাবে প্রাসঙ্গিক প্রমাণ করতে হবে—এই ধারণাটাই আমার কাছে ভয়ংকর মনে হয়।

শিল্প এবং মানবিক বিদ্যার বৃহত্তর ক্ষেত্রে অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও রাজনৈতিক ভূমিকা আছে। কিন্তু এসব বিষয়কে ন্যায্যতা দেওয়ার জন্য কখনোই তাদের সামাজিক বা রাজনৈতিক উপকারিতার ওপর নির্ভর করা উচিত নয়।

তাই মানবিক বিদ্যাকে রাজনৈতিকভাবে ‘প্রাসঙ্গিক’ করে তোলার যে চাপ, সেটা নিয়ে আমি খুবই চিন্তিত।

আমি মনে করি না, মানবিক বিদ্যার রাজনৈতিক গুরুত্ব নির্ভর করে সেটি কতটা সরাসরি রাজনৈতিকভাবে প্রাসঙ্গিক তার ওপর। আবার যখন কোনো কাজ সত্যিই রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, সেটা অবশ্যই দারুণ ব্যাপার। কারণ রাজনীতিকে শুধু রাজনীতিবিদ বা সমাজবিজ্ঞানীদের হাতে ছেড়ে দেওয়া খুবই দুঃখজনক হবে।

সত্যি বলতে, আমার যদি অন্য ধরনের দক্ষতা থাকত, যদি নিজের পেশা বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকত, তাহলে আমি দার্শনিক হওয়ার চেয়ে শিল্পী হতে বেশি চাইতাম।

মানে, পৃথিবীতে এর চেয়ে ভালো কাজ আর কী হতে পারে, একেবারে সুন্দর কিছু সৃষ্টি করতে পারা?

প্রশ্ন: সৌন্দর্যের কথা যখন উঠল, আপনার বইয়ে Simone de Beauvoir-এর একটি অসাধারণ, প্রায় মাথা ঘুরিয়ে দেওয়া অংশ উদ্ধৃত করেছেন। সেখানে তিনি লিখেছেন, নারী-পুরুষের মধ্যে সত্যিকারের সমতা থাকলে যৌনতা কেমন হতে পারে।

শ্রীনিবাসন: ঠিক তাই। নারীবাদের এই পুরোনো গুরুত্বপূর্ণ লেখাগুলোকে মানুষ প্রায়ই ভুলভাবে পড়ে, অথবা ভুলভাবে মনে রাখে। অনেকেই মনে করেন, এসব লেখা সবসময় খুব গম্ভীর, হতাশাবাদী, বিরক্তিকর এবং শুধু রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে লেখা।

আমি এই ধারণাটা ভাঙতে চেয়েছি।

যেমন Shulamith Firestone-এর লেখার শেষদিকে তিনি ভালোবাসার জন্য আরও স্বাধীন হওয়ার কথা বলেন।

Valerie Solanas-এর লেখায় আমরা কল্পনাশক্তির মুক্তির কথা পাই।

আর কল্পনাশক্তির মুক্তি Andrea Dworkin-এর চিন্তারও খুব গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অথচ আমরা তাঁকে এমন একজন মানুষ হিসেবে ভাবি, যিনি মানুষের জীবন ও সমাজ সম্পর্কে সবসময় অত্যন্ত নেতিবাচক ছিলেন।

কিন্তু তাঁরও একটি স্বপ্ন ছিল।

তিনি শুধু আরও কিছু চেয়েছিলেন!

অনেক নারীবাদী লেখা সম্পর্কে আমি মানুষকে যে বিষয়টি বোঝাতে চাই, তা হলো সবটাতেই সন্তুষ্টি আসেনি।

এটা শুধুই নেতিবাদ বা হতাশা নয়। বরং মানুষের জীবনকে অন্যরকমভাবে কল্পনা করার গভীর আকাঙ্ক্ষা।

বিশেষ করে নারীদের কল্পনাশক্তির ওপর যে সীমাবদ্ধতা আমরা অনুভব করি, তার বিরুদ্ধে এক ধরনের গভীর অসন্তুষ্টি এসব লেখার মধ্যে আছে।

প্রশ্ন: তাহলে আমরা যখন নিজেদের যৌন আকাঙ্ক্ষাকে ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে না দেখে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয় হিসেবে ভাবি, তখন সেই আকাঙ্ক্ষাগুলো নিয়ে কী করা উচিত, এ নিয়ে কি কোনো দ্বন্দ্ব তৈরি হয়?

যৌন আকাঙ্ক্ষার রাজনীতিকে সম্মিলিতভাবে মোকাবিলা করার কোনো উপায় কি আছে?

শ্রীনিবাসন: আমি যখন প্রথম সেই প্রবন্ধটি লিখেছিলাম, যেটি পরে আমার বইয়ের নাম হয়েছে, তখন আমি একটি বিষয় তুলে ধরতে চেয়েছিলাম। সেটা হলো, যৌনতার ক্ষেত্রে সম্মতি-কেন্দ্রিক ‘সেক্স পজিটিভ’ ধারণা এবং ইন্টারসেকশনালিটির মধ্যে যে একটি টানাপোড়েন আছে, সেটা নিয়ে খুব বেশি আলোচনা হয় না।

আপনি যদি সত্যিই ভাবতে চান যে বর্ণগত আধিপত্য এবং পিতৃতন্ত্রের মধ্যে কী সম্পর্ক, তাহলে আপনাকে এটাও ভাবতে হবে যে আমাদের যৌন আকাঙ্ক্ষাগুলো কীভাবে জাতি ও বর্ণের সামাজিক কাঠামোর মাধ্যমে তৈরি হয়।

এটা একেবারেই নতুন কোনো ধারণা নয়। Angela Davis, Shulamith Firestone-এর সমালোচনা করতে গিয়ে ঠিক এই বিষয়টিই তুলে ধরেছিলেন।

তবে বইয়ে আমি পরিষ্কার করে বলতে চেয়েছি যে আমি এমন কোনো প্রকল্পের কথা বলছি না যেখানে প্রত্যেক মানুষ বসে বসে নিজের যৌন আকাঙ্ক্ষা তার রাজনৈতিক বিশ্বাসের সঙ্গে মেলে কি না, সেটা পরীক্ষা করবে।

আর তার চেয়েও কম আমি এমন কোনো ‘মাওবাদী অধিবেশন’-এর কথা বলছি, যেখানে সবাই বসে একে অপরকে বলতে থাকবে, কার আকাঙ্ক্ষা তার রাজনৈতিক বিশ্বাসের সঙ্গে মেলে আর কারটা মেলে না।

কারণ আমার কাছে এটা খারাপ রাজনীতি।

যুক্তরাষ্ট্রের নারীমুক্তি আন্দোলনের ইতিহাস দেখলেই বোঝা যায়, যখন সামাজিক পরিবর্তনের জন্য কাজ করা একটি দল ব্যক্তিগত জীবন আর রাজনৈতিক বিশ্বাসের মধ্যে কথিত অমিল নিয়ে অতিরিক্ত ব্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন কী হতে পারে।

তবে একই সঙ্গে এই বিষয়টি নিয়ে কিছুটা ভাবাও দরকার, তাই না?

কারণ এটিই তো New Left-কে পুরোনো Left থেকে আলাদা করে।

আমি চাই, ব্যক্তিগত জীবনকে রাজনৈতিক করে তোলার অর্থ কী – এই প্রশ্নের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটা একটু দ্বিধাপূর্ণ হোক। আমরা যেন একেবারে সরলভাবে এর উত্তর না দিই।

আমি আসলে এমন একটি বিষয় প্রস্তাব করছি, যেটি queer মানুষ অনেকদিন ধরেই বলে আসছেন।

সেটা হলো নিজের আকাঙ্ক্ষা আসলে কী হতে পারে, তা নিয়ে আরও কল্পনাপ্রবণ ও সৃজনশীলভাবে ভাবা।

এখানেই psychoanalysis বা মনোবিশ্লেষণের প্রসঙ্গ আসে। কারণ এই ধারাটি আমাদের একটি বিষয় শেখায় – আমরা নিজেদের সম্পর্কে, নিজেদের যৌনতা এবং যাদের প্রতি আমাদের আকর্ষণ আছে তাদের সম্পর্কে নানা বিষয় ক্রমাগত দমন করি।

এই দমনের সবটাই হয়তো খারাপ নয়। কিন্তু অন্তত কিছু ধরনের দমন আমাদের আরও স্বাধীনভাবে বাঁচতে বাধা দেয়।

তাই আমি এটাকে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রকল্প হিসেবে নয়, মুক্তির প্রকল্প হিসেবে দেখতে চাই।

আমি এমন কাউকে বলছি না, যে নিজেকে পুরোপুরি heterosexual মনে করে—“তোমাকে queer হতেই হবে।”

আমি শুধু বলছি, আমরা যেন একটু বেশি খেয়াল করি সেই মুহূর্তগুলোতে, যখন আমরা নিজের প্রকৃত আকাঙ্ক্ষার কথা শুনি না, বরং কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক শক্তির কথা শুনি, যা আমাদের বলে দেয় – কী চাইতে হবে না।

আমার কাছে এটা queer চিন্তার একটি বৃহত্তর ধারার সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ।

প্রশ্ন: সাংবাদিকরা আগে আপনাকে ‘হট ফিলোসফার’, ‘যিনি ভালো সাক্ষাৎকার দেন’ – এই ধরনেরভাবে উপস্থাপন করেছেন। এটা নিশ্চয়ই বিরক্তিকর।

কিন্তু একই সঙ্গে আমরা সবাই তো শরীরী মানুষ। আপনি এবং আমি দুজনেই পৃথিবীর সামনে বেশ নারীত্বপূর্ণ বা femme চেহারা নিয়ে উপস্থিত হই।

আমাদের শরীর এবং আমাদের প্রতি অন্যদের দৃষ্টিভঙ্গির অভিজ্ঞতা নিশ্চয়ই যৌন আকাঙ্ক্ষার মতো বিষয় নিয়ে আমরা কী অনুভব করি এবং কী লিখি, তার ওপর প্রভাব ফেলে।

আপনি কি এ নিয়ে ভাবেন?

শ্রীনিবাসন: আমার এ বিষয়ে অনেক কিছু বলার আছে। কিন্তু তার কতটা প্রকাশ্যে বলব?

আমার নিজের শরীরের সঙ্গে আমার সম্পর্ক মোটেও পুরোপুরি স্বস্তির নয়।

শুধু গভীর দার্শনিক অর্থে নয়; অর্থাৎ আমার এই সীমিত, ভঙ্গুর, শরীরী অস্তিত্বের সঙ্গে আমার যে সমস্যা, সেটার কথাও বলছি না।

আমি একজন নারী হিসেবে, একজন নারী-সত্তা হিসেবে সমাজের কাছে যেভাবে দৃশ্যমান বা বোধ্য হয়ে উঠি, তার সঙ্গেও আমার কোনো পুরোপুরি স্বস্তির সম্পর্ক নেই।

ছোটবেলায় আমার সবচেয়ে তীব্র কল্পনাগুলোর একটি ছিল সম্পূর্ণ শরীরহীন হয়ে যাওয়া।

সম্ভবত পাঁচ বা ছয় বছর বয়স থেকেই আমার মধ্যে এই অনুভূতি তৈরি হয়েছিল। কৈশোর পেরিয়ে কলেজ পর্যন্ত এই কল্পনাটা আমার সঙ্গে ছিল।

এটা এমন ছিল না যে আমি নিজের চেহারার কোনো একটি নির্দিষ্ট দিক পছন্দ করতাম না।

আমি কোনোভাবেই দেখতে চাইতাম না।

আরেকটি তীব্র কল্পনাও আমার ছিল। সেটা হলো একজন সন্ন্যাসীর জীবন গ্রহণ করা।

Sanyas হলো সংস্কৃত শব্দ, যার অর্থ ত্যাগ বা সবকিছু ছেড়ে দেওয়া।

সন্ন্যাসী এমন একজন মানুষ, যিনি নিজের নাম, পরিবার, সম্পত্তি, সামাজিক ও নাগরিক পরিচয়—সবকিছু ত্যাগ করেছেন। তাঁর কোনো সম্পত্তি থাকে না। তিনি গেরুয়া পোশাক পরেন এবং মানুষের কাছ থেকে ভিক্ষা নিয়ে পৃথিবীতে ঘুরে বেড়ান।

ছোটবেলায় আমার কাছে এটা এতটাই স্বাভাবিক মনে হতো যে আমি ভাবতাম, পৃথিবীতে বেঁচে থাকার সঠিক উপায় এটাই।

কোনো সামাজিক ভূমিকা গ্রহণ করতে অস্বীকার করা, সেই অনুযায়ী পোশাক না পরা, অন্যের দৃষ্টি বা মূল্যায়নকে প্রত্যাখ্যান করা, কোনো সামাজিক পরিচয় বা সম্পর্কের কাঠামোর মধ্যে নিজেকে আটকে না রাখা—আমার মনে হতো, এর মাধ্যমেই আমার মন সম্পূর্ণ স্বাধীন হতে পারবে।

আজও আমি অস্তিত্বের এই ধারণাটিকে খুব শক্তিশালী বলে মনে করি।

এবং এখনও আমার কাছে গভীরভাবে কষ্টের যে আমরা নিজেদের সম্পূর্ণভাবে নিজেরা তৈরি করতে পারি না। আমরা সকালে ঘুম থেকে উঠে সম্পূর্ণ নতুন একজন মানুষ হয়ে যেতে পারি না।

তবে পোশাকের ক্ষেত্রে আমি তুলনামূলকভাবে নারীত্বপূর্ণ পোশাকই পরি।

এর একটা কারণ হলো, পৃথিবীর মধ্যে চলাফেরা করতে এতে আমার সুবিধা হয়। এটা অনেকটা এমন একটি বর্মের মতো, যা আমি নিজের ওপর পরতে পারি।

অবশ্য এর মানে এই নয় যে আমি পোশাক ভালোবাসি না।

উদাহরণস্বরূপ, Vogue-এ ছবি প্রকাশিত হওয়ায় আমি খুব খুশি হয়েছিলাম।

মজার ব্যাপার হলো, সেই লেখাটি প্রকাশিত হওয়ার প্রথম দিন আমাকে খবরটি দিয়েছিলেন Jacqueline Rose।

আমি তাঁকে ভীষণ শ্রদ্ধা করতাম।

একবার Jacqueline-কে British Library-এর reading room-এ ঢুকতে দেখেছিলাম। তখনও আমি তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে চিনতাম না, যদিও তাঁকে খুব শ্রদ্ধা করতাম।

তিনি মাথা থেকে পা পর্যন্ত Chanel পরে এসেছিলেন।

আমার ঠিক সামনে এসে বসলেন।

আমি তাঁর দিকে তাকিয়ে এতটাই মুগ্ধ হয়ে গেলাম যে বুঝলাম, আজ আর আমার কোনো কাজ হবে না।

তাই আমি আমার জিনিসপত্র গুছিয়ে উঠে চলে গেলাম।

প্রশ্ন: আপনি আগে psychoanalysis-এর কথা বলেছিলেন। আপনার কথায় মনে হচ্ছে আপনি বিশ্বাস করেন যে আমরা নিজেদের সম্পর্কে কতটা জানতে পারি, তারও যথেষ্ট সীমা আছে।

এই ধারণার যৌন আকাঙ্ক্ষা, পরিচয় এবং সাধারণভাবে রাজনীতির ওপরও প্রভাব আছে।

কিন্তু এখনকার সময়ে এই ধারণাটা কিছুটা অপ্রচলিত মনে হয়।

শ্রীনিবাসন: হ্যাঁ, এটা এখন অপ্রচলিত।

নিজেকে নিজের কাছেই পুরোপুরি অজানা বা অস্পষ্ট মনে করা – এটা এখন খুব জনপ্রিয় ধারণা নয়।

আপনি identity politics-এর সঙ্গে এর একটা সম্পর্কের কথা বলেছেন, সেটা ঠিক।

মানুষ যখন সামাজিক স্বীকৃতির জন্য লড়াই করে, তখন নিজের সম্পর্কে নিজেই একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ার অধিকারকে খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে করা স্বাভাবিক।

অর্থাৎ, “আমি কে, সেটা আমি নিজেই জানি এবং আমি নিজেকে যা বলছি, সেটাই চূড়ান্ত সত্য”—এই ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

কিন্তু একই সঙ্গে এমন কিছু জায়গাও আছে যেখানে আমরা নিজেদের সম্পর্কে কতটা জানতে পারি, সেটা নিয়ে হয়তো অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠি।

উদাহরণ হিসেবে trans politics-এর কথা বলা যায়।

একটি মুক্তিকামী এবং trans-inclusive নারীবাদের ক্ষেত্রে আমরা সাধারণত মনে করি, একজন trans ব্যক্তি যখন বলেন তিনি কে, তখন তাঁর নিজের পরিচয়ের কথাকে বিশ্বাস করা দরকার।

কিন্তু trans-exclusionary feminism-এর ক্ষেত্রেও একটা বিষয় লক্ষ্য করা জরুরি।

এখানে অনেক সময় মানুষ নিজেদের সম্পর্কে জানার ক্ষমতা নিয়ে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হয়ে পড়ে।

এই জায়গায় Jacqueline Rose-এর একটি প্রশ্ন খুব গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, trans-exclusionary feminists-দের প্রশ্ন করা উচিত:

“তুমি নিজেকে কী মনে করো? তুমি কীভাবে এত নিশ্চিত যে নিজের শরীর, জন্মের সময় নির্ধারিত লিঙ্গ এবং সমাজ তোমাকে যেভাবে দেখে – এসবের সঙ্গে তোমার নিজের সম্পর্ক পুরোপুরি পরিষ্কার ও স্বস্তিপূর্ণ?”

তাঁর বক্তব্য হলো, gender system-এর বিরুদ্ধে আমাদের যে অস্বস্তি, দ্বন্দ্ব বা প্রতিবাদ আমরা দমন করি, সেগুলো পুরোপুরি হারিয়ে যায় না।

সেগুলো আমাদের স্বপ্ন ও কল্পনার মধ্যে ফিরে আসে।

সেখানে আমরা সবসময় স্থিরভাবে শুধু নারী বা পুরুষ থাকি না।

এটা খুব গভীর একটি উপলব্ধি।

তারপর রাজনৈতিক প্রশ্নটা হয়ে যায়:

একটি নিপীড়নমূলক gender system-এর সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার কোন পদ্ধতিকে সমাজ স্বীকৃতি দেয়, আর কোন পদ্ধতিকে দেয় না?

পুরুষদের নিয়েও একই ধরনের সমস্যা আছে।

আমরা কখনও কখনও এমনভাবে পুরুষদের নিয়ে কথা বলি, যেন প্রত্যেক পুরুষের নিজের পুরুষত্বের সঙ্গে খুব স্বাভাবিক ও স্বস্তির সম্পর্ক রয়েছে।

যেন একটি নির্দিষ্ট ধরনের পুরুষালি আচরণ বা ভূমিকার দাবি মেনে চলা খুব সহজ, যারা সেই আদর্শের সঙ্গে মানানসই, তাদের জন্যও; যারা মানানসই নয়, তাদের জন্যও।

যেন এর মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব নেই, উদ্বেগ নেই, নাটকীয়তা নেই।

আমার মনে হয়, বাস্তবতার বর্ণনা হিসেবে এটা ভুল এবং রাজনৈতিকভাবেও খুব একটা কাজে আসে না।

নিজের সম্পর্কে গল্প বলার অধিকার খুব গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু একই সঙ্গে আমরা যে গল্প নিজেদের সম্পর্কে বলি, সেটা পরিবর্তন করার অধিকারও আমাদের থাকা উচিত।

আর নিজেদের গল্প আমরা একা তৈরি করি না। অন্য মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যেই আমরা নিজেদের সম্পর্কে গল্প তৈরি করি।

আমি নিজের সম্পর্কে যা বলি, তার অনেকটাই তৈরি হয়েছে অন্য মানুষের কাছ থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা ও ধারণার মাধ্যমে। তাঁরা আমাকে নিজের সম্পর্কে বুঝতে সাহায্য করেছেন।

প্রশ্ন: আপনার বইয়ে অনেক কঠিন এবং তীব্র বিতর্কিত বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। আপনার লেখা ভুলভাবে বোঝা হবে – এ নিয়ে কি আপনি চিন্তিত?

শ্রীনিবাসন: আমরা কি এমনভাবে লিখতে পারি যাতে কেউ কোনোভাবেই আমাদের ভুল বুঝতে না পারে?

এ ধরনের লেখা আসলে খারাপ লেখা।

আমার বইটি নিয়ে Irish Times-এ Naoise Dolan-এর লেখা একটি ছোট রিভিউ আমার খুব ভালো লেগেছিল।

তিনি প্রায় এমন কিছু লিখেছিলেন:

“শ্রীনিবাসন ভুলভাবে বোঝা নিয়ে চিন্তিত নন। তিনি এমনভাবে লেখেননি যাতে তাঁর শত্রুরা তাঁকে নির্মমভাবে ভুল বুঝতে না পারে।”

আমি অবশ্য ইচ্ছা করে নিজেকে ভুল বোঝার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য লিখিনি।

অন্যভাবে লেখার কথা আমার মাথাতেই আসেনি।

কিন্তু এখন আমি বুঝি, যে লেখা জটিল বিষয় নিয়ে ভয় না পেয়ে গভীরভাবে চিন্তা করতে চায়, সেটাকে সবসময়ই ভুলভাবে বোঝার সুযোগ থাকে।

অনেক গুরুত্বপূর্ণ নারীবাদী লেখার ক্ষেত্রেই এটা সত্যি।

এই লেখাগুলো নিজেদের নানা দিক থেকে পাঠকের সামনে উন্মুক্ত করে দেয়। আর আমার মনে হয়, সেই উন্মুক্ততাই শেষ পর্যন্ত খুব মূল্যবান হয়ে ওঠে।

প্রশ্ন: এই কারণেই কি আপনি Dworkin বা Firestone-এর মতো লেখকদের পড়ান?

শ্রীনিবাসন: সবাই Firestone-এর সেই বিখ্যাত কথাটা মনে রাখে, যেখানে তিনি কুমড়োর মতো কিছু মলত্যাগ করার কথা বলেছেন।

অবশ্য সেটাও তাঁর নিজের কথা নয়। তিনি তাঁর এক বন্ধুর কথা উদ্ধৃত করেছিলেন। কিন্তু মানুষ যা ভুলে যায়, তার মধ্যে একটি হলো “Down with Childhood” নামে তাঁর অসাধারণ অধ্যায়টি। এখানে তিনি শিশুদের ওপর নিপীড়ন নিয়ে লিখেছেন। আমি আমার শিক্ষার্থীদের এই অধ্যায়টি পড়াতে খুব ভালোবাসি। কারণ তাদের অনেকের কাছে মনে হয়, তারা এমন একটি বিষয় নিয়ে কথা বলার সুযোগ পেয়েছে, যা তারা বহুদিন ধরে বলতে চেয়েছিল। তাদের অনেকেরই এ অভিজ্ঞতা ছিল, শিশু হিসেবে তাদের ইচ্ছাকে আটকে দেওয়া, তাদের ছোট বা অক্ষম মনে করা, তাদের ওপর নিয়ন্ত্রণ করা এবং তাদের কথাকে গুরুত্ব না দেওয়া।

এরপর Firestone শিশুদের যৌন স্বাধীনতা এবং pedophilia-এর মতো বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। এখানে আমরা খুবই অস্পষ্ট এবং কঠিন একটি জায়গায় ঢুকে পড়ি। কিন্তু #MeToo-এর সময় কিছু নারীবাদী মনে করেন, এই কারণেই আমাদের Firestone পড়া উচিত নয়।

আমার কাছে এটা গভীরভাবে  anti-intellectual মনে হয়। শুধু তাই নয়, আমার সহকর্মী Rachel Fraser যেটাকে নারীবাদের “carnivalesque” বলেছেন, এটাও এতে অনুপস্থিত।

অর্থাৎ নারীবাদের মধ্যে পাগলামি, অদ্ভুতত্ব, অস্বাভাবিকতা এবং সাহসী চিন্তার যে জায়গা আছে।

আমার মনে হয়, আমরা যদি সেটা হারিয়ে ফেলি, তাহলে খুব দুঃখজনক হবে।

প্রশ্ন: আপনি কি মনে করেন এই গুণটি শুধু নারীবাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, নাকি যেকোনো আন্দোলনের জন্য?

শ্রীনিবাসন: যেকোনো র‍্যাডিক্যাল বা মৌলিক রাজনৈতিক চিন্তার ধারার জন্যই এটা গুরুত্বপূর্ণ।

ইউটোপিয়ান বা আদর্শ সমাজ নিয়ে লেখা বইগুলোতে যে অদ্ভুত ধারণা থাকে, সেটা কোনো আশ্চর্যের বিষয় নয়।

Thomas More-এর Utopia-এর কথাই ভাবুন। বইটি নানা অদ্ভুত সম্ভাবনায় ভরা।

কারণ যে রাজনৈতিক কল্পনাশক্তি আমাদের নতুন ধরনের সমাজের সম্ভাবনা দেখতে সাহায্য করে, সেই একই কল্পনাশক্তি কখনও কখনও কিছু একেবারে পাগলাটে ধারণাও তৈরি করে।

মানুষের জীবনে কী কী সম্ভব, সেই ধারণাকে যেমন বিস্তৃত করতে হবে, তেমনি মানুষের জীবনের কোন বিষয়গুলো আনন্দদায়ক, আকর্ষণীয় এবং উপভোগ্য হতে পারে, সেই ধারণাকেও বিস্তৃত করতে হবে।

আমার মনে হয়, একটি র‍্যাডিক্যাল রাজনীতির কেন্দ্রে এই বিষয়টি থাকতেই হবে।

প্রশ্ন: আপনার এই নিয়ম না মানা বা প্রচলিত সীমা ভাঙার বিষয়টির প্রতি আপনার যে টান, সেটা বেশ আকর্ষণীয়।

কারণ আপনি নিজেই তো এসব প্রতিষ্ঠানের ভেতর দিয়ে উঠে এসেছেন এবং প্রচুর সাফল্য পেয়েছেন।

একভাবে বলতে গেলে, আপনাকে তো একেবারে আদর্শ ‘A student’ মনে হয়।

শ্রীনিবাসন: আমি Chichele Chair পাওয়ার পর আমাকে নিয়ে একটি প্রোফাইল প্রকাশিত হয়েছিল।

আমার এক পুরোনো বন্ধু আমাকে লিখে বলেছিল, তার মনে হয়েছে লেখাটিতে আমার দুষ্টুমি, খেলাচ্ছলে থাকার ক্ষমতা এবং মজার দিকটা একেবারেই ধরা পড়েনি। আমি তাকে বলেছিলাম, এটা সাংবাদিকের ব্যর্থতা নয়। আমি নিজেই সেটা দেখাইনি। কারণ আমাকে যেন মানুষ গুরুত্ব দিয়ে নেয়, সেজন্য আমি সচেতনভাবে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।

আমার জীবনে প্রচুর অগোছালো, নিয়মভাঙা ও মজার ব্যাপার আছে। কিন্তু এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে আমি সেই ‘A student’, অনেক দিক থেকেই একজন আদর্শ ভারতীয় মেয়ে, যে পরীক্ষায় ৯৭ পেলে বাড়ি ফিরত, আর বাবা মজা করে জিজ্ঞেস করতেন, “বাকি তিন নম্বর কোথায় গেল?”

অবশ্য তিনি জেনেশুনেই ভারতীয় বাবাদের একটি প্রচলিত stereotype-এর সঙ্গে খেলছিলেন। কিন্তু এই আচরণের পেছনে বাস্তবতাও আছে।

প্রশ্ন: আমার কাছে একটা বিষয় বেশ লক্ষণীয়। এই বইয়ে আপনি যৌনতা, সহিংসতা এবং এমন কিছু বিষয় নিয়ে লিখেছেন, যেগুলো অত্যন্ত ব্যক্তিগত বলে মনে হতে পারে। কিন্তু আপনি নিজের সম্পর্কে খুব কমই বলেছেন। এটা কি কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত?

শ্রীনিবাসন: এই প্রবন্ধগুলো এখনকার প্রচলিত অর্থে ব্যক্তিগত প্রবন্ধ নয়। আমি কখনো সেই অর্থে ব্যক্তিগত প্রবন্ধ লিখিনি। কিন্তু একই সঙ্গে এই লেখাগুলো আমার কাছে খুব ব্যক্তিগত।

আমার একটা অভ্যাস আছে, আমি সব দর্শনকেই কোনো না কোনোভাবে লেখকের নিজের সত্তার প্রকাশ বা বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে পড়ি। আমার নিজের লেখার ক্ষেত্রেও আমি এটা অনুভব করি।

শুধু এই প্রবন্ধগুলো নয়, জ্ঞানতত্ত্বের মতো আরও বিমূর্ত ও প্রযুক্তিগত বিষয় নিয়ে লেখা আমার কাজেও আমি মনে করি, আমার নিজের উপস্থিতি খুব স্পষ্টভাবে আছে।

আমার কাছে মনে হয়, আমি সেসব লেখার মধ্যেও এক ধরনের ছায়ার মতো উপস্থিত থাকি।

আরেকটা ব্যাপার হলো, আমি স্বভাবগতভাবেই খুব ব্যক্তিগত মানুষ। আমি একা থাকতে চাই এবং আমাকে যেন ছেড়ে দেওয়া হয়, সেটা চাই।

আমি ভয়ও পাই।

আমি ইন্টারনেটকে ভয় পাই। বিশেষ করে ইন্টারনেটে কোনো কথা প্রকাশ করার পর সেটা আর কখনো মুছে ফেলা যায় না, এই বিষয়টি আমাকে ভয় দেখায়। একবার নিজের সম্পর্কে কোনো কিছু প্রকাশ করলে, মানুষ পরবর্তীতে সবসময় সেই তথ্যের ভিত্তিতেই আপনাকে দেখতে পারে।

আমি জীবনী লেখার ধারণা নিয়েও সন্দিহান। যদিও দর্শন পড়ার সময় আমার নিজের মধ্যেও জীবনী দিয়ে লেখাকে বোঝার একটা প্রবণতা আছে, অথচ সাধারণত দর্শনকে ব্যক্তির জীবনী দিয়ে ব্যাখ্যা করা ঠিক তার বিপরীত ধারণা হিসেবে দেখা হয়।

তবে আমার বইয়ে ব্যক্তিগত জীবনের কিছু মুহূর্ত অবশ্যই আছে। এক জায়গায় আমি বলেছি, আমার বন্ধুরা মজা করে বলে যে আমি প্রায় ‘সাদা’। এই কথাটা বইয়ে রাখব কি না, সেটা নিয়ে আমি অনেক ভেবেছিলাম। অনেক সময় প্রবন্ধ লেখার সময় আমার ব্যক্তিগত কিছু কথা থাকে, পরে আমি সেগুলো বাদ দিয়ে দিই। কিন্তু এবার এই কথাটা রেখে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। আমার মনে হয়েছিল, এটা বইয়ের সবচেয়ে ব্যক্তিগত মুহূর্তগুলোর একটি। কিন্তু আমার কাছে নিজের সম্পর্কে এমন কিছু বলা মানেই নিজেকে অত্যন্ত ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেওয়া।

দর্শন আমার ভালো লাগার একটা কারণ সম্ভবত এটাই। দর্শন কাউকে পুরোপুরি নিরাপদ বা invulnerable করে না। কিন্তু অন্তত কিছুটা দূরত্ব তৈরি করে। কিছুটা সমালোচনামূলক দূরত্ব দেয়। কিছুটা এমন একটা অনুভূতি দেয় যে আমি পুরোপুরি অন্যের কাছে উন্মুক্ত নই।

এখানে আরেকটা প্রশ্নও আছে, আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ কতটা জ্ঞান পাওয়া সম্ভব?

আমি নিজের সীমাবদ্ধতাগুলো সম্পর্কে খুব সচেতন।

হ্যাঁ, আমি একজন নারী। আমি একজন বর্ণগত সংখ্যালঘু নারী। কিন্তু একই সঙ্গে আমি অত্যন্ত সুবিধাপ্রাপ্ত একজন মানুষ। আর সত্যি বলতে, আমি নিজের গল্পকে খুব একটা আকর্ষণীয় মনে করি না।

প্রশ্ন: হঠাৎ আপনার অক্টোপাস নিয়ে লেখা প্রবন্ধের একটা কথা মনে পড়ছে। সেখানে আপনি চিড়িয়াখানা ও অ্যাকুয়ারিয়ামের কথা বলতে গিয়ে বলেছিলেন, কিছু প্রাণীকে পুরো প্রজাতির উপকারের জন্য বন্দি অবস্থায় মানুষের সামনে প্রদর্শন করা হয়।

সম্ভবত আপনার সঙ্গে এই কথার যে সম্পর্ক আমি তৈরি করছি, সেটা বলা ঠিক হচ্ছে না।

শ্রীনিবাসন: না, বরং দেখুন, আমার কাছে এ ধরনের মুহূর্তই এমন, যখন মনে হয় আমি আসলে নিজের সম্পর্কেই কথা বলছি। আমার কাছে এটাই এক ধরনের ব্যক্তিগত লেখার ধরন। আমি ব্যক্তিগত প্রবন্ধ লিখি না, কিন্তু আমার মনে হয়, আমি সবসময় কোনো না কোনোভাবে নিজের সম্পর্কেই কথা বলছি।

অক্টোপাস নিয়ে লেখা সেই প্রবন্ধটিও আমার কাছে এমনই মনে হয়।

আসলে দূরত্ব ও ঘনিষ্ঠতা, আমরা কতটা কাউকে জানতে পারি এবং কতটা তাকে কখনোই পুরোপুরি বুঝতে পারি না – এই বিষয়গুলো আমার কাছে অত্যন্ত ব্যক্তিগত চিন্তার বিষয়।

আমি শুধু নানা ধরনের বিষয় ব্যবহার করে এসব নিয়ে লিখি। কখনো আমি অক্টোপাস নিয়ে কথা বলি। কখনো জ্ঞানতত্ত্বের খুব জটিল কোনো তাত্ত্বিক যুক্তি নিয়ে কথা বলি। কিন্তু আমার মনে হয়, শেষ পর্যন্ত আমি সবসময় অন্য মানুষের মনকে বোঝার ব্যাপারে নিজের সমস্যাগুলো নিয়েই কাজ করছি। নিজের মনকে বোঝার সমস্যা, আর আমার পরিচিত ও ভালোবাসার মানুষগুলোর মনকে বোঝার সমস্যা। তাই হয়তো এটাকেও নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখার একটি উপায় বলা যায়। শুধু সেটা গোপনে করা হয়।

Leave a Reply