October 29, 2026
ফিচার ১মুক্তমত

রেমিট্যান্সের সুফল রাষ্ট্রের, ঝুঁকির দায় কেন নারীর কাঁধে?

কানিজ ফাতেমা তনিমা ।। দেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী শ্রমিকদের অবদানের কথা আমাদের সকলেরই জানা।এই মানুষগুলোকে বলা হয় দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি। রেমিট্যান্সের পরিমাণ বাড়লে দেশের অর্থনীতিতে স্বস্তির গল্প আমরা সকলেই জানি কিন্তু এই গল্পের পেছনে যেসব মানুষের ঘাম, শ্রম এবং আত্মত্যাগ জড়িয়ে রয়েছে তাঁদের গল্প কি আমরা শুনি?

বিশেষ করে সেই সকল নারীদের – যারা পারিবারিক অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা নিয়ন্ত্রণের আশায় দেশ ছাড়েন অথচ বিদেশের মাটিতে গিয়ে প্রতিনিয়ত নিজের জীবন, শরীর ও মর্যাদার ওপরই নিজেদের নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে?

বাংলাদেশি নারী প্রবাসী শ্রমিকদের একটা বড় অংশ বিদেশে কাজ করতে গিয়ে ভয়াবহ শোষণ, নির্যাতন এবং মানসিক ট্রমার শিকার হয়ে আসছে। সাম্প্রতিক চিত্রই যদি কেবল দেখি ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর মধ্যে ১,৬৮৭ জন বাংলাদেশি নারী শ্রমিক দেশে ফিরেছে যার মধ্যে ৯৭৯ জনই ফিরেছে সৌদি আরব থেকে ; Dhaka Post- এর তথ্য অনুযায়ী।

এই সংখ্যা কেবল ফিরে আসা নয় ; এটা একটা অভিযোগপত্র।

দারিদ্র্য ঘোচাতে এসকল শ্রমিকেরা ২০২৬ সালে এসেও সৌদির চার দেয়ালের ভেতরে যে অমানবিক ও নারকীয় পরিস্থিতির শিকার হন তা অত্যন্ত মর্মান্তিক।

প্রতিশ্রুত কাজের বদলে অন্য কাজ, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা,বেতন না পাওয়া,খাবার ও বিশ্রামের অভাব,চলাফেরায় বাধা, শারীরিক নির্যাতন এবং যৌন সহিংসতার মতো অভিযোগ বারবার সামনে এসেছে। কেউ দেশে ফেরেন নিঃস্ব হয়ে, কেউ গুরুতর শারীরিক আঘাত নিয়ে, কেউ কেউ প্রচণ্ড রকম মানসিক ট্রমা নিয়ে- যার কোনো স্বীকৃতি নেই, চিকিৎসা নেই। কেউ হয়তো ফেরেনই না। আবার কারো কারো মরদেহ আসে পরিবারের কাছে।

সৌদি আরবে গৃহকর্মীদের নিয়ে Human Rights Watch এবং Amnesty International এর গবেষণায় একই চিত্র উঠে এসেছে, দিনে ১৮ ঘন্টা পর্যন্ত কাজ,সপ্তাহে ৭ দিনই কাজ।পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া,ঘরে তালাবন্ধ রাখা, মাসের পর মাস ছুটিহীন। BRAC এর কর্মকর্তারা একই অভিযোগের কথা বলেছেন।

প্রতিবাদের পরিণতি আরো ভয়ংকর। যারা অভিযোগ জানাতে সাহস করেন,তাদের অনেকে উল্টো চুরির মিথ্যা অভিযোগ ও মজুরি হারানোর মুখে পড়েন। BRAC – এর তথ্য অনুযায়ী নির্যাতনের কারণে ফিলিপাইন ও ইন্দোনেশিয়া সৌদিতে কর্মী পাঠানো বন্ধ করলে বাংলাদেশি নারীদের সেই  শূন্যস্থানে পাঠানো শুরু হয়। অন্যরা সরে  এসেছে,আমরা ঢুকেছি।

যেখানে নারী হারিয়ে যাচ্ছে

প্রতিনিয়ত হওয়া এই নির্যাতনের গল্পগুলো কোনো দুর্ঘটনা নয়। এটা এমন এক ব্যবস্থার ফল, যেখানে নারীর সুরক্ষার দায় নেওয়ার মতো কেউ নেই। প্রশ্নটা খুবই স্পষ্ট এই ফাঁক তৈরি হয় কোথায়?

প্রথম এবং প্রধান সমস্যাটা মূলত সৌদি আরবের আইনেই। দেশটির শ্রম আইন এখনো গৃহকর্মীদের বাইরে রেখেছে। অর্থাৎ সাপ্তাহিক ছুটি, ওভার টাইম শ্রম পরিদর্শকের তদারকি, এসব কোনটাই তাদের নেই। ২০২১ সালে কাফালা ব্যবস্থায় সংস্কার এলেও তা গৃহকর্মীদের ছুঁয়ে যায়নি। নিয়োগকর্তার থেকে পালিয়ে আসা কর্মী সেখানে আইনের চোখে অপরাধী, এমনকি অনির্দিষ্টকালের আটকের ঝুঁকিতেও পড়েন। অর্থাৎ নির্যাতনের শিকার নারী পালালে শাস্তি পান আর নির্যাতনকারী থাকেন নিরাপদ।

সবচাইতে নির্মম বিষয় যেটা, একজন নারী সৌদির বন্ধ ঘরে পৌঁছানোর আগেই এবং অবগত না হয়েই এই ব্যবস্থার ভিতরে ঢুকে পড়েন। আর এই ঢোকার পথটা আমাদের নিজেদের দেশের হাতে।তাহলে প্রশ্নটা হল তাকে পাঠানোর আগে রাষ্ট্র কি তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে ?

কাগজে-কলমে উত্তরটা আশ্বাসজনক। আমাদের Overseas Employment and Migrants Act 2013 নিরাপদ ও ন্যায্যা অভিবাসন নিশ্চিত করার উদ্দেশ্য তৈরি। এতে নিয়মের জন্য জরিমানা, লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিলের বিধান আছে। কিন্তু আইনের ভিতরে ঢুকলে দেখা যায়,যে জায়গাগুলো নারীর জন্য সবচেয়ে জরুরী,সেখানেই ফাঁক। অভিযোগ জানানোর পদ্ধতি এতে বিস্তারিতভাবে ঠিক করা নেই। রিক্রুটিং এজেন্সির ওপর নজরদারি ও পরিদর্শন কীভাবে হবে, তাও আইনে স্পষ্ট নয়। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন উদ্বেগ জানিয়েছে যে প্রতারক এজেন্টের জবাবদিহিতার আওতায় আনার ব্যবস্থা দুর্বল।আইন শাস্তির কথা বলছে, কিন্তু অভিযোগ নেওয়ার ও তদন্ত করার পথ তৈরির বেলায় আইন নীরব।

এইসকল নারীদের এই দুর্দশার দায় কে নেবে?

রেমিট্যান্সের সুফল রাষ্ট্র নেয় কিন্তু ঝুঁকির দায় কেন পুরোটাই নারীর কাঁধে?

অর্থনীতির হিসেবে এই সকল নারীদের অবদানকে যতোটা গুরুত্ব দেওয়া হয়,তাদের নির্যাতন, মৃত্যু ও ট্রমার হিসাব  কি কোথাও ঠিক একই গুরুত্বের সঙ্গে রাখা হয়?

সত্যটা অস্বস্তিকর। রেমিট্যান্সের প্রশ্নে রাষ্ট্র ঠিক যতোটা সরব এই সকল নারী কর্মীদের নিরাপত্তার বেলায় ঠিক ততোটাই নীরব।

শুধুমাত্র উপাধি দিয়ে দায় সারার এই পদ্ধতি থেকে সরে আসতে হবে এবং সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। এটা কোনো মানবিকতার জায়গা থেকে নয় বরং এটাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব। প্রথমত, প্রতারনার ফাঁদে দালাল ও এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল  করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে । দ্বিতীয়ত, যাওয়ার আগে নারীদের বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ এবং চুক্তির সঠিক তথ্য তাদের  বোধগম্য ভাষায় জনাতে হবে ,তৃতীয়ত সৌদি আরবের মতো গন্তব্য দেশের সঙ্গে এমন বাধ্যতামূলক চুক্তি করতে হবে, যেখানে কর্মঘণ্টা, ছুটি,বেতন ও পাসপোর্টের অধিকার নিশ্চিত থাকবে।চতুর্থত ফেরার পর ভুক্তভোগী নারীদের বিনামূল্যে মানসিক চিকিৎসা, কাউন্সেলিং ও পুর্নবাসনসহ নারী শ্রমিকদের নির্যাতন, মৃত্যু ও ফেরার কারন আলাদা করে প্রকাশ করতে হবে। কারণ যে সমস্যা লিপিবদ্ধ হয় না, তার সমাধানও হয় না।

অর্থনীতির সাফল্যের মূল্য কে দিচ্ছে আর লাভ কে নিচ্ছে এই প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে আর এগোনো যাবে না।

[ফেমিনিস্ট ফ্যাক্টরে প্রকাশিত মুক্তমত লেখকের নিজস্ব বক্তব্য]

Leave a Reply