May 27, 2026
ফিচার ১কলাম

কর্মজীবী নারী: ক্লান্ত মনের শ্রান্তি

সারাওয়াত রশীদ ।। বর্তমান বিশ্বে নারীরা শিক্ষা, কর্মসংস্থান, প্রশাসন, গবেষণা, স্বাস্থ্যসেবা, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডসহ প্রায় সব ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। সমাজ ও অর্থনীতির অগ্রগতিতে তাদের অবদান দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু এই অর্জনের আড়ালে লুকিয়ে থাকে এক নীরব সংগ্রাম, যা খুব কমই আলোচনায় আসে। একজন কর্মজীবী নারীকে প্রতিদিন একই সঙ্গে অফিস, পরিবার, সন্তান, সামাজিক দায়িত্ব এবং নিজের ব্যক্তিগত জীবনের ভার বহন করতে হয়। বাইরে থেকে তাকে যতটা দৃঢ় ও সফল মনে হয়, বাস্তবে তার ভেতরের ক্লান্তি, মানসিক চাপ এবং অবসাদ অনেক গভীর।

একজন কর্মজীবী নারীর দিন সাধারণত খুব ভোরে শুরু হয়। পরিবারের অন্য সদস্যরা যখন ঘুমিয়ে থাকেন, তখন থেকেই তার ব্যস্ততা শুরু হয়ে যায়। রান্না করা, পরিবারের সদস্যদের প্রয়োজনীয় জিনিস গুছিয়ে দেওয়া, সন্তানের স্কুলের প্রস্তুতি, বয়স্ক সদস্যদের খোঁজ নেওয়া—সবকিছু সামলে তাকে নিজের অফিসের জন্যও প্রস্তুত হতে হয়। অনেক সময় নিজের শারীরিক অসুস্থতা বা মানসিক ক্লান্তিকেও উপেক্ষা করে তাকে দায়িত্ব পালন করতে হয়। কারণ সমাজ নারীর দায়িত্বকে “স্বাভাবিক” হিসেবে ধরে নেয়, কিন্তু তার কষ্টকে সবসময় গুরুত্ব দিয়ে দেখে না।

অফিসে পৌঁছানোর পরও তার সংগ্রাম শেষ হয় না। বরং সেখানে শুরু হয় আরেক ধরনের চাপ। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা, সহকর্মীদের সঙ্গে সমন্বয় বজায় রাখা, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার প্রত্যাশা পূরণ করা—এসবের পাশাপাশি অনেক নারীকে প্রতিনিয়ত নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে হয়। অনেক সময় পুরুষ সহকর্মীদের তুলনায় নারীদের কাজকে কম গুরুত্ব দেওয়া হয় অথবা তাদের সিদ্ধান্তকে সহজভাবে গ্রহণ করা হয় না। কর্মক্ষেত্রের এই অদৃশ্য বৈষম্য নারীর মানসিক চাপকে আরও বাড়িয়ে তোলে।

কিছু অফিস পরিবেশ আবার নারীদের জন্য সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বৈরী হয়ে ওঠে। কখনো অনাকাঙ্ক্ষিত মন্তব্য, কখনো অবমূল্যায়ন, কখনো দায়িত্ব পালনে অযথা বাধা—এসব পরিস্থিতি একজন নারীকে মানসিকভাবে দুর্বল করে দেয়। অনেক নারী নিজের সম্মান ও অবস্থান বজায় রাখতে গিয়ে নীরবে সবকিছু সহ্য করেন। কারণ প্রতিবাদ করলেও তাকে “অতিরিক্ত সংবেদনশীল” বা “সমস্যা তৈরি করা ব্যক্তি” হিসেবে দেখা হতে পারে।

অফিস শেষে একজন পুরুষ কর্মী হয়তো কিছুটা বিশ্রামের সুযোগ পান, কিন্তু অধিকাংশ কর্মজীবী নারীর ক্ষেত্রে বাস্তবতা ভিন্ন। বাসায় ফিরে আবার রান্না, সন্তানের পড়াশোনা দেখানো, ঘর গোছানো, পরিবারের সদস্যদের চাহিদা পূরণ—সবকিছু তার ওপরই বর্তায়। ফলে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত তার কাজের যেন কোনো শেষ নেই। এই অবিরাম দায়িত্ববোধ ধীরে ধীরে তাকে মানসিকভাবে ক্লান্ত করে তোলে।

সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, অনেক পরিবার এখনও নারীর চাকরিকে পূর্ণাঙ্গ পেশা হিসেবে গ্রহণ করতে পারেনি বরং এখনও নারীর চাকরিকে “অতিরিক্ত” বা “সহায়ক” বিষয় হিসেবে দেখে। পরিবারের অনেকের ধারণা, “অফিস তো করছই, আবার ট্রেনিং, সেমিনার বা ফিল্ড ভিজিটের কী দরকার?” কেউ কেউ মনে করেন, অফিস ও বাড়ি সামলানোই যথেষ্ট; এর বাইরে কোনো পেশাগত কার্যক্রম যেন বাড়তি ঝামেলা। অথচ বাস্তবতা হলো, যেকোনো পেশায় দক্ষতা বৃদ্ধি, নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন এবং পদোন্নতির জন্য প্রশিক্ষণ ও মাঠপর্যায়ের কাজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অনেক সময় কোনো নারী অফিসের প্রয়োজনে অন্য জেলায় প্রশিক্ষণে গেলে পরিবারের ভেতরে অসন্তোষ তৈরি হয়। প্রশ্ন ওঠে—“এটা কি এড়ানো যেত না?”, “অন্য কাউকে পাঠানো যেত না?”, কিংবা “পরিবার রেখে এত বাইরে থাকার প্রয়োজন কী?” এসব কথার মাধ্যমে একজন নারীকে বোঝানো হয় যে তার পেশাগত উন্নয়ন যেন পরিবারের জন্য অস্বস্তিকর বিষয়। ফলে তিনি নিজের স্বপ্ন ও দায়িত্বের মাঝখানে আটকে যান। একদিকে কর্মক্ষেত্রে দক্ষতার প্রমাণ দেওয়ার চাপ, অন্যদিকে পরিবারের মানসিক অস্বীকৃতি—দুটোর মাঝখানে পড়ে তিনি ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়েন।

অনেক নারী তখন নিজের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়া বন্ধ করে দেন। তারা ধীরে ধীরে নিজের ইচ্ছা, স্বপ্ন ও ব্যক্তিগত আনন্দ থেকে দূরে সরে যান। নিজের জন্য আলাদা সময় নেওয়া, বিশ্রাম করা, কোনো শখ চর্চা করা—এসব যেন বিলাসিতা হয়ে দাঁড়ায়। দীর্ঘদিন ধরে এই অবস্থা চলতে থাকলে মানসিক অবসাদ, হতাশা ও একাকিত্ব তৈরি হতে পারে। কিন্তু বেশিরভাগ সময় এই কষ্টগুলো দৃশ্যমান হয় না, কারণ সমাজ নারীর সহ্যশক্তিকে অতিরিক্ত স্বাভাবিক হিসেবে ধরে নেয়।

তবুও কর্মজীবী নারীরা থেমে যান না। পরিবারের প্রতি ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ এবং নিজের স্বপ্নকে ধরে রাখার জন্য তারা প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে যান। তারা একদিকে সংসারকে আগলে রাখেন, অন্যদিকে কর্মক্ষেত্রেও নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করেন। এই দ্বৈত দায়িত্ব পালন সহজ নয়। এর জন্য প্রয়োজন পরিবার, সমাজ ও কর্মক্ষেত্রের সহানুভূতি এবং সহযোগিতা।

পরিবারকে বুঝতে হবে, একজন নারীর পেশাগত উন্নয়ন কোনো ব্যক্তিগত বিলাসিতা নয়; এটি তার অধিকার এবং আত্মমর্যাদার অংশ। অফিসের প্রশিক্ষণ, কর্মশালা বা ফিল্ড ভিজিট তার দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা বাড়ায়, যা ভবিষ্যতে তার কাজের মান উন্নত করতে সাহায্য করে। তাই এসব বিষয়কে অপ্রয়োজনীয় মনে না করে বরং উৎসাহ দেওয়া উচিত।

একই সঙ্গে কর্মক্ষেত্রেও নারীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। সহকর্মীদের সম্মানজনক আচরণ, মানসিক সহায়তা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং কাজের স্বীকৃতি একজন নারীকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। কর্মজীবী নারীদের শুধু দায়িত্বের প্রতীক হিসেবে না দেখে একজন মানুষ হিসেবে তাদের অনুভূতি, ক্লান্তি ও মানসিক চাহিদাকেও মূল্য দিতে হবে।

একজন কর্মজীবী নারী শুধু অর্থ উপার্জন করেন না; তিনি পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাই তার ক্লান্ত মনকে বোঝা, তার শ্রমকে সম্মান করা এবং তার স্বপ্নকে গুরুত্ব দেওয়া আমাদের সামাজিক দায়িত্ব। কারণ একজন নারী যখন মানসিকভাবে সুস্থ ও সম্মানিত বোধ করেন, তখন তার পরিবার, কর্মক্ষেত্র এবং সমাজও আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

 

[ফেমিনিস্ট ফ্যাক্টরে প্রকাশিত কলাম লেখকের নিজস্ব বক্তব্য]

Leave a Reply