May 26, 2026
ফিচার ১মুক্তমত

মাতৃত্ব

অদিতি সরকার ।। আমি মা হইনি তবু আমার অনেক দিন ধরে এ বিষয়ে কিছু লিখতে ইচ্ছে হল। অনেকের ভালো লাগবে বা লাগবে না হয়ত।

আমি যখন এ লেখাটি লিখছি তখন বাংলাদেশে শিশুদের শরীরে মহামারির মত হাম ছড়িয়ে পড়েছে। বাড়তে বাড়তে এ সংখ্যাটি সরকারি রেকর্ড অনুযায়ী সাড়ে পাঁচশ প্রায়। বাবা মায়ের আহাজারির ভিডিওতে ফেসবুক সয়লাব।

কারো প্রথম, কারো দ্বিতীয়, কারো অনেক বছরের সাধনার ফল। হাম কেড়ে নিল তাদের জীবন নাকি প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা সে বিষয়ে উচ্চবাচ্য নেই।

যাই হোক, মাতৃত্বের প্রসঙ্গে আসি। নিঃসন্দেহে মা যারা হয়েছেন এ অনুভূতি তাদের কাছে অতুলনীয়। তবে সেই মাতৃত্বেরও অনেক রঙ আছে। ইউটিউবে একটি পডকাস্টে অভিনেতা অনির্বাণ চক্রবর্তীর একটা কথা অনেকদিন আমার কানে বেজেছে। অভিনেতা বলছিলেন, বাচ্চাকে ভালোবাসা আর বাচ্চার দায়িত্ব নিয়ে ভালোবাসা দুটো এক জিনিস নয়। কথাটা মাথা থেকে বের করতে পারিনি।

কিছুদিনেআগেই মা দিবস গেছে। এ যাবতকালে মায়েদের নানা রূপ নানাভাবে দেখার সুযোগ হয়েছে। গর্ভধারিনী মা তো মা-ই। এর বাইরে আমি শিক্ষিকাদের মাঝে মাকে দেখেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের যে খালা নিজের প্লেট থেকে তার জন্য রান্না করা খাবার থেকে মুখে তুলে খাইয়ে দিয়েছেন, মা তিনিও। ঘনিষ্ট আত্মীয়স্বজনের মাঝেও মায়ের ছায়া পেয়েছি।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখি নানা আঙ্গিকের মা। কোন মা জলের মতই সহজ। কেউ ভীষন সাহসি, কোনো মা সন্তানের আশ্রয়, কেউ বন্ধু। সন্তানহারা মায়ের আকুতিও দেখতে পাই।

শুধুই মানব শিশুর মা নয়। খুব মুগ্ধ হয়ে দেখি পোষ্য সন্তানের মায়েদের। তাদের আনন্দ, তাদের উদ্বেগ, সন্তানের চলে যাবার কষ্টে তাদের ভেঙ্গে পড়া – সবই আন্দোলিত করে।

আমাদের সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি মায়েদের প্রতি খুব কড়া, আমি বলব নির্মম। মায়েদের হতে হবে সুপারওম্যানের মত। যেন কোনো সাধ আহ্লাদ থাকতে পারবে না। তাদের যেন আলাদা কোন জীবন থাকতে নেই। যদি কখনো কোনো মা নিজের ইচ্ছেমত কিছু করতে চান তাহলেই আমাদের সমাজ বনামের আগে স্বার্থপর এর ট্যাগ লাগিয়ে দেয়।

আমাদের সমাজের একটা হাস্যকর ধারনা হল কর্মজীবী মায়েদের সন্তান মানুষ হয় না। এই বস্তাপচা ধারনাকে তুড়ি মেরেও কর্মজীবী মায়েরা সন্তানদের চমৎকার মানুষ করছেন।

এবার একটু অন্যভাবে দেখ যাক। জগতে এমন মানুষও আছে যারা স্বেচ্ছায় মাতৃত্বের স্বাদ নিতে চায় না। সর্বক্ষণ কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর স্বভাব যে সমাজের, অবলীলায় সে সমাজ তাদের উপহাস, বিদ্রুপ করে থাকেন। কিন্তু কেউ তার জঠরে সন্তান ধারন করতে চান কিনা খুব কমই জানতে চাওয়া হয়।

যারা কোনোদিনই সন্তান গর্ভে ধারন করতে পারবেন না তাদের মানসিকভাবে নিগৃহীত করার জন্য আমাদের সমাজে একটা বাংলা শব্দ প্রচলিত আছে। বাঁজা। বাচ্চা হচ্ছে না বলে আমাদের সমাজে এখনো অহরহ বিদ্রুপের শিকার হতে হয়।

আরেক ধরনের মানসিক অত্যাচার মায়েদের ওপর করা হয় যদি তারা পুত্র সন্তানের জন্ম না দিতে পারে। এই আধুনিক যুগেও কন্যা ভ্রুণ বা কন্যা সন্তান হত্যার খবর আসে।

মাতৃত্ব কী সেটা বোঝার আগেই ধর্ষনের শিকার বা বাল্যবিবাহের করুণ বাস্তবতায় সন্তান জন্মদান ও পরবর্তী জটিলতায় অহরহ মৃত্যু হচ্ছে অজস্র সম্ভাবনার। এ ভাইরাসের শেষ কোথায় জানা নেই।

মাতৃত্বের নানা আঙ্গিক, বিচিত্র তার রূপ। সকল আনন্দ ব্যথা বেদনা নিয়ে মাতৃত্ব সুন্দর। মাতৃত্ব হোক স্বেচ্ছাধীন ও নিরাপদ।

হাম মহামারিতে যে মায়েরা হারিয়েছেন তাদের সন্তান, তারা নিজেদের যতটা সামলে নেয়া যায়, নিন। পৃথিবীর সকল মায়েদের শুভেচ্ছা।

 

[ফেমিনিস্ট ফ্যাক্টরে প্রকাশিত মুক্তমত লেখকের নিজস্ব বক্তব্য]

Leave a Reply