April 23, 2026
কলামফিচার ২

জেন জি এবং নারীকেন্দ্রিক গালি

মেহেরুন নূর রহমান ।। বাংলাদেশের সমাজে নারীকেন্দ্রিক বা মিসোজিনিস্টিক গালি ব্যবহার একটি দীর্ঘকালীন সমস্যা, যা আমাদের প্যাট্রিয়াক্যাল বা পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। মেয়েদের ঊন ভাবার যে ঐতিহ্য আমাদের সমাজে বিদ্যমান, এ তারই প্রতিফলন। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, বিশেষ করে জেনারেশন জি (জেন-জি), যাদের জন্ম ১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে, তারা এই প্রবণতাকে নতুন করে জনপ্রিয় করে তুলেছে। সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম, মিমস, ভাইরাল ভিডিও, স্লোগান, প্রতিবাদের ভাষা এবং দৈনন্দিন কথোপকথনে এই ধরনের ভাষা ছড়িয়ে পড়ছে। অনেকে অভিযোগ করছেন যে জেন-জি’রা  মিসোজিনিস্টিক গালি ছাড়া সাধারণ কথাবার্তাও চালাতে পারে না।

এই প্রবণতা কেবল ভাষাগত স্তরে সীমাবদ্ধ নয়, বরং আমাদের সমাজের চলমান নারী-পুরুষের বৈষম্যকে আরো গভীরতর করছে এবং এর প্রভাব নারী-পুরুষের মধ্যে বিভেদ এবং মানসিক স্বাস্থ্যের উপর পড়ছে। একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে যে বাংলাদেশে অনলাইন মিসোজিনির হার ৭৮ শতাংশের বেশি যা নারীদের ডিজিটাল স্পেসে অংশগ্রহণকে বাধাগ্রস্ত করছে ( NETZ Bangladesh Study, 2024)।

জেন জি-এর এই মিসোজিনিস্টিক আচরণ বা নারীবিদ্বেষী গালাগালির পেছনে কারণ বহুমুখী। প্রথমত, সোশ্যাল মিডিয়া – ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক এবং ইনস্টাগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্ম যেখানে  নারীকে অবজেক্টিফাই করা কনটেন্টের ছড়াছড়ি। নারীদের ছবি বা তাদের তৈরি কন্টেন্টের নিচে অপমানজনক কন্টেন্ট দিয়ে ভরা থেকে। তাদের পোশাক, চেহারা, স্বাস্থ্য সবকিছু নিয়েই নোংরা কমেন্ট করা হয়। রেডপিল ফিলোসফি জেন জি যুবকদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। রেড পিল এমন একটি ধারণা, যা ওয়েবসাইট, ব্লগ এবং অনলাইন ফোরামে নারীবিদ্বেষ এবং নারীবাদের বিরোধিতাকে প্রমোট করে। রেড পিল নীতি পুরুষদের এই ধারণা দেয় যে নারীবাদ দ্বারা প্রভাবিত সমাজে পুরুষরা নিপীড়িত লিঙ্গ। এই ধারণা অনুসারে, নারীরা ‘স্বাধীনতা’ চাইলে সমাজ অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে।ক্রিকেটার তানজিম হাসান সাকিবের মতো সেলিব্রিটিদের মন্তব্যে এসব প্রতিফলিত হয় আর সাধারণ নারী-বিদ্বেষী যুবকদের কথা বাদই দিলাম। সোশ্যাল মিডিয়া অ্যালগরিদম এই কন্টেন্টগুলোকে প্রমোট করে, যার ফলে যুবকরা (নারীরাও!) এই ভাষাকে স্বাভাবিক মনে করে।

দ্বিতীয়ত, পুরুষতান্ত্রিক সমাজের গভীর প্রভাব। বাংলাদেশের সমাজে নারীকে অধীনস্থ দেখার মনোভাব আবহমান ধরে চলছে। আমাদের সংস্কৃতি, ধর্ম, এবং  তথাকথিত ঐতিহ্য এই মনোভাবকে যুগে যুগে নানাভাবে ইন্ধনা জুগিয়ে যাচ্ছে। জেন জি যুবকরা এই মনোভাবকে আধুনিকতার ছদ্মবেশে গ্রহণ করছে। লক্ষ্যহীন জীবন, সঠিক শিক্ষার অভাব, অর্থনৈতিক অস্থিরতা, বেকারত্ব এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে ফ্রাস্ট্রেটেড যুবকরা তাদের হতাশা দূর করার হাতিয়ার হিসেবে নারীদের টার্গেট করে এবং পুরুষ হবার পাওয়ার প্রদর্শন করে। নারীবিদ্বেষী গালিগালাজ অনুষঙ্গ হিসেবে আসে। দুঃখের ব্যাপার হলো বহু পুরুষতান্ত্রিক মনোভাবসম্পন্ন জেন-জি মেয়েরাও একই রকম আচরণ করে, নিজে নারী হয়েও অন্য নারীদের নোংরা ভাষায় আক্রমণ করে।

বিভিন্ন গবেষণায় প্রমাণিত যে মিসোজিনি এবং সহিংসতার মধ্যে যোগসূত্র রয়েছে। এছাড়া, সুশিক্ষার অভাব যুবক সমাজের নারীদের প্রতি অসম্মানের মনোভাব গড়ে তোলে। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় জেন্ডার সেনসিটিভিটির অভাব এই সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

২০২৪ সালের কোটা আন্দোলনের মধ্যেও মিসোজিনির প্রকাশ ঘটেছে। নারীরা এতে থাকলেও, নারীদের প্রতি অসম্মান দেখানো হয়েছে। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর অন্তর্বাস নিয়ে ছাত্রদের মকারি এরই প্রমাণ। আন্দোলনের পর নারী পাবলিক ফিগারদের উপর আক্রমণ, নারীদের গতিবিধি সীমিত করা এবং জেন্ডার-ভিত্তিক সহিংসতা বেড়েছে (Report from Voice, August, 2025)। জেন-জি যুবকরা নেতৃত্ব দিলেও, তাদের মধ্যে নারীদের প্রতি অসম্মান অব্যাহত রয়েছে। ধর্মের নামে নারীদের হেনস্তা করার পরিমান বেড়েছে বহুগুণ, এবং মূলত জেন-জি’রাই এসবের নেতৃত্ব দিচ্ছে। অনলাইন স্পেসে নারীদের টার্গেট করে মিসোজিনিস্টিক কনটেন্ট বাড়ছে ( Report from Voice, August, 2025)। একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে যে জুলাই আন্দোলনের পর নারী সাংবাদিকদের প্রতি লিঙ্গভিত্তিক মিসইনফরমেশন এবং হ্যারাসমেন্ট বেড়েছে, এবং নারীদের ডিজিটাল উপস্থিতিকে ধর্মীয় বা নৈতিক অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে (report from ResearchGate, July, 2025) ।

মিসোজিনি বা নারীবিদ্বেষ এবং রেড-পিল ফিলোসফি গ্রহণের এই প্রবণতার প্রভাব গভীর এবং বহুমুখী। প্রথমত, এটি নারী-পুরুষের মধ্যে বিভেদকে গাঢ়তর করছে, এবং নারীদের আগের চেয়ে বেশি অসুরক্ষিত করছে। দ্বিতীয়ত, এর কারণে সমাজে সহিংসতা এবং মানসিক চাপ বাড়ছে। বাংলাদেশে নারীদের প্রতি সহিংসতার শিকড় গভীর। জাতীয় সমীক্ষায় দেখা গেছে যে বাংলাদেশের অর্ধেকের বেশি নারী সহিংসতার শিকার এবং বেশিরভাগ ক্ষত্রে এটা ঘটে তাদের ইন্টিমেট বা নিকটতম সঙ্গীদের দ্বারা (Violence Against Women (VAW) Survey 2024)। জেন-জি’র মিসোজিনি মনোভাব এই সহিংসতাকে আরও উস্কে দিচ্ছে, এবং এটি নারীর অর্থনৈতিক এবং সামাজিক অগ্রগতিকে দারুনভাবে বাধাগ্রস্ত করছে। যখন নারীরা পাবলিক স্পেসে আসেন, তাদের প্রতি অপমান বাড়ে, তাদের হেনস্তা করা হয় যা তাদের অনেকসময় পিছিয়ে যেতে বাধ্য করে।

জেন জি’র মাধ্যমে নারীকেন্দ্রিক গালিগালাজ বৃদ্ধি সামাজিক অবক্ষয়ের লক্ষণ। এটি কেবল ভাষাগত নয়, বরং গভীর মিসোজিনিস্টিক মনোভাবের প্রতিফলন। সংকটের বিষয় হলো এসব গালাগালির গ্রহণযোগ্যতা বাড়ার প্রবণতা। এ অবস্থার পরিবর্তনের জন্য শিক্ষা ব্যবস্থায় জেন্ডার সেনসিটিভিটি অন্তর্ভুক্ত করা,  মিডিয়া রেগুলেশন এবং প্যারেন্টিং-এর উন্নয়ন দরকার। দরকার প্রশাসনের হস্তক্ষেপ। জেন-জি যদি এ ব্যাপারে সচেতন হয় এবং তাদের ডিজিটাল শক্তিকে ইতিবাচকভাবে ব্যবহার করে, তাহলে এই সমস্যা কমানো সম্ভব। অন্যথায়, এটি সমাজকে আরও বিভক্ত করবে এবং নারীদের অধিকারকে পিছিয়ে দেবে।

 

[ফেমিনিস্ট ফ্যাক্টরে প্রকাশিত কলাম লেখকের নিজস্ব বক্তব্য]

Leave a Reply