বোঝাপড়ার ঋতু
ডা.সাজিয়া আফরিন ।।
রিয়া আর আদনানের সংসারের শুরুটা ছিল আনন্দ আর মায়ামাখা, প্রশান্তি আর হাসির আলোয় ভরা।
রিয়া একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবী, শহরের এক ব্যস্ত অফিসে চাকরি করে। সকালবেলা মেট্রোর ভিড়ে দাঁড়িয়ে তার দিন শুরু হয়, আর রাত শেষ হয় ল্যাপটপের নীল আলোয়। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয়, একজন আত্মবিশ্বাসী, শক্ত মনের নারী।
আর আদনান একজন আর্কিটেক্ট—শহরের দালান-কাঠামোর ভিড়ে যে মানুষটি প্রতিদিন নতুন নতুন স্বপ্নের নকশা আঁকে। সকালবেলা দু’জনেই ব্যস্ত ছুটে চলে। তবে ছুটির সকালে একসাথে নাশতা, সন্ধ্যায় ছাদে দাঁড়িয়ে শহরের আলো গোনা, বৃষ্টির দিনে এক ছাতার নিচে ভেজা,রাতের বেলা হুটহাট বেরিয়ে পড়া, গন্তব্যহীন হেঁটে চলা। আবার কখনো বারান্দায় দাঁড়িয়ে একসাথে চা খাওয়া,হাতের উপর হাতের স্পর্শ! ভালো সময়গুলো কেটে যাচ্ছিল নরম রোদ্দুরের মতো।
আদনান বলত,
“তুমি হাসলে আমার ডিজাইন করা ইট-কাঠের কাঠামোগুলোও যেন আলো পায়।”
রিয়া লজ্জায় চোখ নামিয়ে নিত।
কত মিষ্টি মুহূর্ত কেটে যেত চোখের পলকে!
কিন্তু মাসের একটা নির্দিষ্ট সময় এলেই সেই আলোটা হঠাৎ ম্লান হয়ে যেত।
রিয়ার শরীর ক্লান্ত, মাথা ভারী, মন অস্থির। সামান্য কথায় রাগ, মাথার ভেতর যেন অকারণ চিন্তার ভিড়। সামান্য কথাতেই চোখ ভিজে ওঠে, হাসির জায়গায় বিরক্তি, নীরবতার জায়গায় অভিমান। সে নিজেও বুঝতে পারে না এই পরিবর্তনের উৎস কোথায়। প্রিয়জনের সাথেই সবচেয়ে বেশি রূঢ় আচরণ, সহ্যই হয় না কাউকে!
অফিস থেকে ফিরে আদনান কাছে এলে সে দূরে সরে যেত। এক কাপ চা পর্যন্ত চাইলে রিয়ার কণ্ঠে তীক্ষ্ণতা। ছোট ছোট কথায় শুরু হয় বাকবিতণ্ডা। ভালোবাসার ঘরে জমতে থাকে অদৃশ্য দূরত্ব।
আদনানের চোখে জমত প্রশ্ন
“আমার সাথেই কেন এমন করো?”
রিয়া নিজেও উত্তর খুঁজে পেত না।
এক সন্ধ্যায় তুচ্ছ একটা কথায় বড়ো ঝগড়া হলো। দরজা বন্ধ করে রিয়া কাঁদল, আর বাইরে দাঁড়িয়ে আদনান বুঝতে পারল তার নকশা করা বাড়ির ভেতরেই যেন ফাটল ধরছে।
ঠিক সেই সময় আদনান শুনতে পায় অ্যাপার্টমেন্টে কানাঘুষা ছড়ায় পাশের ফ্ল্যাটের গৃহিণী মিতু আর রাজীবের সংসার ভেঙে যাচ্ছে, ডিভোর্সের পথে তারা। কারণ শোনা যাচ্ছে কারণ মিতু তার স্বামী, শাশুড়ি, এমনকি সন্তানদের সাথেও রূঢ় ব্যবহার করত। প্রায় প্রায়ই সংসারে এসব নিয়ে চলত অশান্তি। কেউ বোঝেনি, কেউ জানতে চায়নি।ডাক্তারের কাছে গিয়েছে, তিনি বলেছেন কোনো কোনো মেয়েদের মাসিকের আগের সময়টাতে হরমোনের ওঠানামার কারণে মানসিক অবস্থা এমন হতে পারে। পরিবারের মানুষকে বিশেষ এ সময়ে মেয়েটাকে বুঝতে হয়, ধৈর্য রাখতে হয়, সহযোগিতা করতে হয়। কিন্তু এসব কথা জানতে এবং বুঝতে দেরি হয়ে গিয়েছে অনেক। ততদিনে সম্পর্কে এতটাই তিক্ততা এসেছে, শেষ পর্যন্ত গড়িয়েছে বিচ্ছেদে।
ঘটনাটা আদনানকে নাড়া দিল।
সেদিন রাতেই সে পড়তে শুরু করল নারীর শরীর, হরমোন, প্রি-মেনস্ট্রুয়াল সিন্ড্রোম, মানসিক ওঠানামা, নারীর মানসিক ঝড়। বুঝতে পারল—রিয়ার আচরণ ইচ্ছাকৃত নয়, এটা এক শারীরিক-মানসিক যুদ্ধ।
পরদিন। সকালে আদনান চা বানিয়ে রিয়ার পাশে বসে বলল,
“আমি ডিজাইন করি ইট-পাথরের বাড়ি। কিন্তু আমাদের সম্পর্কটা টিকিয়ে রাখতে হলে আমাকে তোমার মনের নকশাটাও বুঝতে হবে।”
রিয়ার চোখ ভিজে উঠল।
সে ফিসফিস করে বলল,
“আমি সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিই তাদেরই, যাদের সবচেয়ে ভালোবাসি। কী যে হয় বুঝি না। নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ থাকে না। ইচ্ছে করে এসব করি না, বিশ্বাস করো।”
আদনান তার হাত ধরল।
“আমি জানি। এই সময়টা তোমার জন্য কঠিন। তুমি লড়ছ, কিন্তু আমায় পাশে পাবে।”
রিয়ার চোখে জল জমে ওঠে। এতদিন যে ভুল বোঝাবুঝির দেয়াল তৈরি হয়েছিল, মুহূর্তেই তাতে ফাটল ধরে।
এরপর থেকে মাসের ঐ সময় এলে ওদের ঘরে নীরব যত্নের এক আলাদা ঋতু নামে। আদনান ধৈর্য ধরে, অকারণে কথা বাড়ায় না, রিয়া নিজের জন্য সময় রাখে। গান শুনে,বই পড়ে, মেডিটেশন করে, ফ্রি হ্যান্ড কিছু এক্সারসাইজ করে।
ভালো সময়ে তারা আবার ছাদে দাঁড়িয়ে শহরের আলো গোনে, বৃষ্টিতে ভেজে, হাসিতে ভরে ওঠে ঘর —যেন প্রতিবার নতুন করে সংসারটা গড়ে তোলে।
তারা শিখে ফেলে —ভালোবাসা শুধু একসাথে থাকা নয়, একে অপরের অদৃশ্য যন্ত্রণা বোঝার নাম।
আর মিতুর ভাঙা সংসার?
তা যেন তাদের জীবনে একটি সতর্ক বাতিঘর।

