September 19, 2026
ফিচার ১কলাম

মূল্য দিতে হবে পুরো বাংলাদেশকে

সাহিন আরা সুলতানা ।। একটি সমাজ বা রাষ্ট্র কতটা উন্নত, তা পরিমাপ করা হয় সেই রাষ্ট্রে নারীর নিরাপত্তা এবং স্বাধীনতার অধিকার দেখে।

বাংলাদেশে নারীর অগ্রযাত্রার গল্পটি একদিনে তৈরি হয়নি। ঘরের চার দেয়াল পেরিয়ে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, প্রশাসন, রাজনীতি, ব্যবসা, চিকিৎসা, গবেষণা, ক্রীড়া ও সংস্কৃতিতে নারীর দৃশ্যমান উপস্থিতি তৈরি হয়েছে কয়েক দশকের সংগ্রাম ও সামাজিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে। একসময় যে মেয়ের বাইরে গিয়ে পড়াশোনা করাই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ, তার পরের প্রজন্ম বিশ্ববিদ্যালয়ে গেছে, চাকরি করেছে, সংসারের হাল ধরেছে, রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশ নিয়েছে। নিজের আয়, নিজের পরিচয় এবং নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার অর্জন করেছে।

এই দীর্ঘ অগ্রযাত্রা বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ায় নারীর ক্ষমতায়নের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণে পরিণত করেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ের বিভিন্ন পরিসংখ্যান ও ঘটনাপ্রবাহ পাশাপাশি রাখলে এখন একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে আসে। দীর্ঘদিন ধরে অর্জিত সেই জায়গা কি আরও বিস্তৃত হচ্ছে, নাকি ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে আসছে? বাংলাদেশের নারীর অগ্রযাত্রার পথে কি উল্টো হাওয়া বইতে শুরু করেছে?

নারীর পৃথিবী সংকুচিত হওয়ার প্রশ্নটি শুধু অপরাধের পরিসংখ্যান দিয়ে বোঝা যাবে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জনপরিসরে নারী স্বাধীনতার প্রশ্নও। ৫ আগস্ট ২০২৪-এর পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশে নারীদের নিরাপত্তা, অধিকার ও সামাজিক অবস্থান এক বড় ধরনের রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে গত কয়েক দশকে অর্জিত নারীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতি, অন্যদিকে বর্তমানের ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তাহীনতা ও রক্ষণশীলতার চাপ – এই দুইয়ের টানাপোড়েনই এখনকার বাংলাদেশের বাস্তবতা।

বিগত দেড়-দুই দশকে বাংলাদেশের নারীরা ঘরের চার দেয়াল ভেঙে বহির্বিশ্বে নিজেদের মেধার সাক্ষর রেখেছেন। পোশাক খাত থেকে শুরু করে করপোরেট অফিস, এভারেস্ট জয় থেকে সাফ ফুটবলের ট্রফি – সবখানেই ছিল নারীর অগ্রগতির জয়জয়কার। আপনি যদি শেখ হাসিনাকে ভুলেও যেতে চান, তাহলেও কী করে অস্বীকার করবেন তাঁর সময়ে নারীদের মহিলাদের ক্ষমতায়ন ছিল দৃশ্যমান। শেখের বেটির আমলে শুধু জাতীয সংসদের স্পিকার বা বিরোধী নেত্রী মহিলা ছিলেন না, শেখ হাসিনার সময়ে  স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কিংবা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদেও মহিলাদের দেখতে পেয়েছিলাম আমরা। এই অপটিক্স বা দৃশ্যমানতা গোটা দেশের মহিলাদের অনুপ্রাণিত করত। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর তৈরি হওয়া ‘নতুন বাংলাদেশ’-এ সেই দৃশ্যপটে এক বড় ধরনের ছন্দপতন ঘটেছে। যে নারীরা দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রেখেছিলেন, যারা সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন সামনের দিকে, আজ তারাই এক চরম নিরাপত্তাহীনতা ও অনিশ্চয়তার মুখোমুখি। বহু বছরের অর্জিত অগ্রগতি যেন রাতারাতি এক অদৃশ্য দেয়ালে এসে হোঁচট খাচ্ছে। নতুন বাংলাদেশের এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় নারীর বহুমুখী সংকটগুলোকে কয়েকটি প্রধান দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন –

১. দৃশ্যমান অগ্রগতির সামনে অদৃশ্য দেয়াল: নারীর ক্ষমতায়ন ও স্বাধীনতার যে সূচকগুলোতে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় উদাহরণ তৈরি করেছিল, বর্তমান পরিস্থিতিতে সেখানে এক ধরনের স্থবিরতা দেখা যাচ্ছে। ঘর থেকে বের হওয়া, রাতে কাজ করা কিংবা পেশাগত কারণে বাইরে যাতায়াতের যে স্বাভাবিক পরিবেশ নারীরা তৈরি করেছিলেন, তা এখন অনেকটাই সংকুচিত। স্বাধীনতার নামে এক নতুন ধরনের সামাজিক সেন্সরশিপ বা নীতিপুলিশি নারীর স্বাভাবিক চলাফেরাকে বাধাগ্রস্ত করছে।

২.মোরালপুলিশিং ও মৌলবাদী চিন্তার সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা: পট পরিবর্তনের পর সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা তৈরি হয়েছে সামাজিক মনস্তত্ত্বে। রাস্তায়, পাবলিক পরিবহনে, এমনকি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও নারীর পোশাক ও আচরণ নিয়ে অযাচিত মন্তব্য এবং হেনস্তার ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। কিছু রক্ষণশীল গোষ্ঠী প্রকাশ্যেই নারীর অধিকার ও তাদের বাইরে কাজ করার বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে। দুঃখজনক বিষয় হলো, সমাজ বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই “নীতিপুলিশি” বা মোরাল পুলিশিংয়ের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক কোনো কঠোর প্রতিরোধ দেখা যাচ্ছে না, যা অপরাধীদের আরও সাহস জোগাচ্ছে।

৩. অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও কর্মক্ষেত্রে মনস্তাত্ত্বিক চাপ: গার্মেন্টস সেক্টরে চলমান শ্রমিক অসন্তোষ এবং বিভিন্ন কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়ছে নারী শ্রমিকদের ওপর। চাকরি হারানোর ভয় এবং বকেয়া বেতনের অনিশ্চয়তায় হাজারো নারী পরিবার নিয়ে বিপাকে পড়েছেন। অন্যদিকে, উচ্চপদস্থ বা করপোরেট সেক্টরে কর্মরত নারীরা এক ধরনের প্রচ্ছন্ন বৈষম্য ও মনস্তাত্ত্বিক চাপের মুখোমুখি হচ্ছেন। সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনে নারীদের যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তাদের একপাশে ঠেলে দেওয়ার প্রবণতা তৈরি হচ্ছে।

৪. সাইবার জগতের অন্ধকার ও চরিত্রহনন: বাস্তব জীবনের চেয়েও অনলাইন বা সাইবার স্পেস এখন নারীর জন্য বেশি অনিরাপদ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্বাধীনচেতা, প্রগতিশীল বা ভিন্নমতের নারী সাংবাদিক, সমাজকর্মী ও সংস্কৃতি কর্মীদের টার্গেট করে সুপরিকল্পিতভাবে চরিত্রহনন (Character Assassination) করা হচ্ছে। এই সাইবার বুলিং ও ট্রোলিংয়ের শিকার হয়ে অনেক নারী আত্মগোপনে যেতে বাধ্য হচ্ছেন অথবা নিজেদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে গুটিয়ে নিচ্ছেন, যা তাদের মতপ্রকাশের অধিকারকে পুরোপুরি হরণ করছে।

৫. প্রশাসনিক দুর্বলতা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি: আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দীর্ঘস্থায়ী শিথিলতা ও আইনি প্রক্রিয়ার শ্লথগতির কারণে পারিবারিক সহিংসতা, ইভটিজিং বা ধর্ষণের শিকার নারীরা সময়মতো আইনি সুরক্ষা পাচ্ছেন না। থানাগুলোতে অভিযোগ নিতে গড়িমসি এবং অপরাধীদের রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাবের কারণে ভুক্তভোগী নারীরাই উল্টো সামাজিক লাঞ্ছনার শিকার হচ্ছেন। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি নারীদের আরও বেশি অসহায় করে তুলছে।

এত বছরের পথচলায় যে জায়গাটি নারীরা  অর্জন করেছিলেন, সেই জায়গা কি আরও বিস্তৃত না হয়ে ধীরে ধীরে ছোট হয়ে আসছে! ঘর থেকে কর্মক্ষেত্র, শিক্ষা থেকে প্রশাসন, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা থেকে জনপরিসরে নিজের মতো করে বেঁচে থাকার অধিকার, সব মিলিয়েই একজন নারীর পৃথিবী। অগ্রযাত্রার পথে যদি সত্যিই উল্টো হাওয়া বইতে শুরু করে, তবে নারীর সেই পৃথিবী সংকুচিত হওয়ার মূল্য শেষ পর্যন্ত শুধু নারীদের নয়, দিতে হবে পুরো বাংলাদেশকেই।

[ফেমিনিস্ট ফ্যাক্টরে প্রকাশিত কলাম লেখকের নিজস্ব বক্তব্য]

Leave a Reply