September 22, 2026
ফিচার ২মুক্তমত

কেবল রাস্তায় না, মব তৈরি হয় মানুষের চিন্তায়

কানিজ ফাতেমা ।। একটি সভ্য সমাজের সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো, সেখানে বিচার হয় আইন ও প্রমাণের ভিত্তিতে; গুজব, আবেগ কিংবা জনতার উন্মত্ততার ভিত্তিতে নয়। কিন্তু যখন কোনো সমাজে আদালতের আগে রায় দিয়ে দেয় জনতা, তখন সেখানে ন্যায়বিচার নয় প্রতিশোধের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়।আর এই প্রতিশোধপরায়ণ সংস্কৃতির সবচেয়ে সহজ শিকার হয় সমাজের প্রান্তিক ও দুর্বল অবস্থানে থাকা মানুষরা। বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক বাস্তবতায় নারীরা এই মব মানসিকতার অন্যতম টার্গেট।

মব জাস্টিস বা জনতার বিচার নতুন কোনো ঘটনা নয়। কিন্তু ২০২৪ এর আগষ্টে এদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মব ভায়োলেন্সের পরিমান আশংকাজনক মাত্রায় পৌঁছেছে। আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিস্তারের কারণে এর ভয়াবহতা বহুগুণ বেড়েছে। এখন একটি পোস্ট, একটি ভিডিও, একটি অভিযোগ কিংবা একটি গুজব মুহুর্তের মধ্যে হাজার হাজার মানুষের কাছে পৌছে যায় ; তারপর শুরু হয় বিচার। সত্যতা যাচাইয়ের বালাই নেই। অভিযোগের ভিত্তিতে একজনকে অপরাধী বানিয়ে সবাই বিচারক বনে বসে থাকে।

আইনের আদালতে একজন অভিযুক্তের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ থাকে। প্রমাণ উপস্থাপনের সুযোগ থাকে। নিজের কথা বলার সুযোগ থাকে। কিন্তু এই নোংরা মব কালচারে অভিযোগই প্রমাণ, অনেক গুজবই সত্য আর জনতার উন্মাদনাই শাস্তি। এটা কোনো সংস্কৃতি কোনো সভ্য সমাজে থাকতে পারে না।

আর এই সংস্কৃতির সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো– নারীদের ক্ষেত্রে বিচারটা শুধুমাত্র ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না ; তা গিয়ে আঘাত করে তার চরিত্র, ব্যক্তিগত জীবন এবং অস্তিত্বের ওপর।

ঘটনাটা কি ঘটেছে তার পরিবর্তে প্রশ্ন ওঠে “সে কেমন মেয়ে?” “তার পোশাক কেমন ছিল?” “সে কার সাথে মিশত?” “তার ব্যক্তিগত জীবন কেমন?”

অর্থাৎ অভিযোগের বিচার না হয়ে শুরু হয় নারীর চরিত্রের বিচার।

এই মানসিকতাই প্রমাণ করে, আমাদের সমাজের একটি বড় অংশ এখনো নারীকে একজন পূর্নাঙ্গ মানুষ হিসেবে দেখতে শেখেনি। একজন নারীর ভুল, মতামত, সিদ্ধান্ত কিংবা স্বাধীনতাকে অনেক সময়ই তার বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

মব সংস্কৃতি কেবল একজন নারীকে আক্রমণ করে না, এটি পুরো একটা সমাজকে ভয় দেখায় ; হাতের মুঠোয় করতে চায়। নারীদের কণ্ঠরোধের একটি অদৃশ্য হাতিয়ার হয়ে কাজ করে এই সংস্কৃতি।

যে সমাজ নারীর স্বাধীনতাকে ভয় পায়, সে সমাজ আসলে নারীর নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে পারে না। নারীর আচরণ নিয়ন্ত্রণকে সুরক্ষা বলে তার ওপর সমাজের পাহারাদারি চাপিয়ে দেওয়াই মব সংস্কৃতির মূল লক্ষ্য।

কিন্তু প্রশ্ন হলো নিরাপত্তা মানেই কি শুধু নারীর চারপাশে দেয়াল তুলে দেওয়া নাকি সমাজের আচরণ পরিবর্তন প্রয়োজন?

কেন একজন নারীর ব্যক্তিগত জীবন সমাজের সম্পত্তি হয়ে যায়? কেন তার প্রতিটি সিদ্ধান্তের ব্যাখা দিতে হয়? কেন একজন পুরুষের ক্ষেত্রে যা স্বাভাবিক তা নারীর ক্ষেত্রে বিতর্কিত হয়ে ওঠে?

এই দ্বৈত মানসিকতার পরিবর্তন না হলে শুধু আইন করে মব সংস্কৃতি বন্ধ করা সম্ভব নয়। কারণ মব কেবল রাস্তায় তৈরি হয় না মব তৈরি হয় মানুষের চিন্তায়। যখন আমরা যাচাই ছাড়া কাউকে দোষী বানাই, যখন একজন নারীর অপমানকে বিনোদন হিসেবে দেখি, তখন আমরাও এই সংস্কৃতিকে শক্তিশালী করি।মব আসলে আপরাধের বিচার চায় না বরং তারা নারীর ওপর নিজেদের অনবদমিত ক্ষোভকে জাহির করার সু্যোগ খোঁজে।

আরেকটা বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন – কেউ অপরাধ করলে অবশ্যই তার বিচার হওয়া উচিত। কিন্তু বিচার আর প্রতিশোধ এক বিষয় নয়। একজন অপরাধীকে শাস্তি দেওয়ার অধিকার আদালতের, কোনো উত্তেজিত জনতার নয়।

কারণ যে জনতা আজ অন্য কারো বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে, কাল সেই একই জনতা অন্য কারো জীবন ধ্বংস করতে পারে শুধুমাত্র অভিযোগের ভিত্তিতে।

একটি রাষ্ট্রের আইনের শাসন দুর্বল হয়ে গেলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষ। আর যে সমাজে নারীর প্রতি আগে থেকেই পক্ষপাত রয়েছে, সেখানে মব সংস্কৃতি নারীদের আরো বেশি অসহায় করে তোলে।

তাই মবের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া মানে অপরাধকে সমর্থন করা নয় বরং এর অর্থ হলো প্রকৃত ন্যায়বিচারের পক্ষে দাঁড়ানো।

আমাদের মনে রাখতে হবে একটা সমাজ ঠিক কতোটুকু সভ্য তা নির্ভর করে সে সমাজের নারীদের অবস্থান কতোটা শক্ত তার ওপর। মবের হাতে বিচার গেলে শুধু একজন নারীর সম্মান ক্ষতিগ্রস্ত হয় না ; ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো সমাজের ন্যায়বোধ।

কারণ যে সমাজে জনতার উন্মাদনা আইনের জায়গা দখল করে নেয়, সেখানে শেষ পর্যন্ত কেউই নিরাপদ থাকে না।

এই অন্ধকার মব সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসাটা কতটুকু সম্ভব এবং সহজ হবে আমার জানা নেই। তবে এই বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে শুধু ক্ষোভ প্রকাশই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত পরিবর্তন। প্রথমত রাষ্ট্র ও প্রশাসনকে মব জাস্টিসের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহন করতে হবে। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া বা গুজব ছড়িয়ে মব তৈরি করা অপরাধীদের দ্রুততম সময়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে,যাতে কেউ নিজেকে আইনের উর্ধ্বে ভাবার সাহস না পায়।

দ্বিতীয়ত আমাদের ডিজিটাল লিটারেসি বা তথ্য সচেতনতা বাড়াতে হবে; সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কোনো কিছু দেখলেই তা প্রথমেই বিশ্বাস না করে সত্যতা যাচাইয়ের মানসিকতা তৈরি করতে হবে। এবং সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ হলো আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক চিন্তাভাবনায় আমূল পরিবর্তন। নারীকে কোনো দুর্বল সত্তা,ভোগ্যপণ্য কিংবা সমাজের পাহারাদারির পাত্র না ভেবে একজন পূর্নাঙ্গ স্বাধীন মানুষ হিসেবে সম্মান করতে শিখতে হবে।

 

[ফেমিনিস্ট ফ্যাক্টরে প্রকাশিত মুক্তমত লেখকের নিজস্ব বক্তব্য]

Leave a Reply