September 23, 2026
ফিচার ১কলাম

বাবলের বাইরে পৃথিবী

সারাওয়াত রশীদ ।। মানুষ সাধারণত নিজের অভিজ্ঞতা, শিক্ষা, পারিবারিক পরিবেশ এবং সামাজিক অবস্থানের ভিত্তিতে পৃথিবীকে বিচার করে। আমরা যেভাবে বড় হই, যেসব মূল্যবোধ শিখি এবং যেসব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাই, সেগুলোই আমাদের চিন্তার জগত তৈরি করে। এই সীমাবদ্ধ চিন্তার জগতকেই অনেক সময় “বাবল” বলা হয়। সমস্যা হলো, অনেকেই বুঝতে পারেন না যে তারা একটি বাবলের মধ্যে অবস্থান করছেন। ফলে তারা মনে করেন, তারা যেভাবে জীবনকে দেখছেন, সেটিই একমাত্র সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি।

নারীদের ক্ষেত্রেও এমন প্রবণতা প্রায়ই দেখা যায়। একজন নারী হয়তো সারাজীবন সংসার সামলেছেন, স্বামীর আয়ের ওপর নির্ভর করেছেন এবং গৃহস্থালির কাজকেই নিজের প্রধান দায়িত্ব হিসেবে দেখেছেন। এতে কোনো সমস্যা নেই, যদি এটি তার নিজের পছন্দ হয়। কিন্তু যখন তিনি মনে করতে শুরু করেন যে সব নারীরই একইভাবে জীবনযাপন করা উচিত, তখন সমস্যার সৃষ্টি হয়।

উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক, একজন নারী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করার পর চাকরি না করে সংসারকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তিনি এতে সন্তুষ্ট এবং সুখী। এটি অবশ্যই সম্মানের বিষয়। কিন্তু যদি তিনি এমন একজন নারীকে সমালোচনা করেন, যিনি নিজের ক্যারিয়ার গড়তে চান বা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে চান, তাহলে তিনি আসলে নিজের অভিজ্ঞতাকে অন্যের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছেন। একইভাবে একজন কর্মজীবী নারী যদি মনে করেন, যারা পূর্ণসময়ের গৃহিণী, তারা জীবনে কিছুই করছেন না, সেটিও একটি সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অনেক সময় মানুষ নিজের সঙ্গে ঘটে যাওয়া অন্যায়কেও স্বাভাবিক বলে ধরে নেয়। সমাজে এমন অসংখ্য নারী আছেন, যারা বছরের পর বছর মানসিক, অর্থনৈতিক বা শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েও সংসার টিকিয়ে রাখেন। কেউ স্বামীর পরকীয়া মেনে নেন, কেউ অপমান সহ্য করেন, কেউ নিয়মিত নির্যাতনের শিকার হন। তাদের অনেকেই বলেন, “সংসার করতে হলে এসব মেনে নিতেই হয়” অথবা “সব পুরুষই এমন”। কিন্তু বাস্তবে এটি কোনো স্বাভাবিক বিষয় নয়। একজন ব্যক্তি কোনো পরিস্থিতি সহ্য করছেন বলে সেটি ন্যায়সঙ্গত হয়ে যায় না।

ধরা যাক, একজন নারী বিয়ের পর চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন কারণ তার পরিবার সেটিই চেয়েছিল। পরে তিনি দেখলেন, অর্থনৈতিকভাবে সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে পড়ায় নিজের কোনো সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারছেন না। কিন্তু দীর্ঘদিন এই বাস্তবতার মধ্যে থাকার কারণে তিনি এটাকেই স্বাভাবিক মনে করতে শুরু করলেন। এরপর যদি তিনি অন্য কোনো মেয়েকে বলেন, “স্বামীর উপার্জন থাকলে মেয়েদের চাকরি করার দরকার নেই”, তাহলে তিনি নিজের অভিজ্ঞতার সীমাবদ্ধতা থেকেই কথা বলছেন। অথচ অন্য একজন নারীর জন্য চাকরি শুধুমাত্র অর্থ উপার্জনের বিষয় নয়; এটি হতে পারে আত্মসম্মান, স্বাধীনতা, আত্মপরিচয় এবং নিরাপত্তার উৎস।

একইভাবে, শহরের একজন উচ্চশিক্ষিত নারী হয়তো ভাবতে পারেন যে গ্রামের নারীরা পিছিয়ে আছে কারণ তারা আধুনিক জীবনধারা অনুসরণ করে না। কিন্তু তিনি হয়তো জানেন না, সেই গ্রামের নারী প্রতিদিন কৃষিকাজ করেন, পরিবার পরিচালনা করেন, সন্তানের পড়াশোনা দেখেন এবং কঠিন সামাজিক বাস্তবতার মধ্যেও সংগ্রাম করে এগিয়ে যান। অর্থাৎ, একজন মানুষের বাস্তবতা অন্যজনের বাস্তবতার সঙ্গে এক নয়।

নারী অধিকার নিয়ে আলোচনা করতে গেলে এই বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। নারী অধিকার মানে সব নারীকে একই রকম হতে হবে, এমন নয়। নারী অধিকার মানে একজন নারীর নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা। তিনি চাইলে সংসার করবেন, চাইলে চাকরি করবেন, চাইলে ব্যবসা করবেন, চাইলে গবেষক বা রাজনীতিবিদ হবেন। আবার কেউ যদি গৃহিণী হিসেবেই নিজের পরিচয়ে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, সেই সিদ্ধান্তও সমানভাবে সম্মানের দাবিদার। মূল প্রশ্ন হলো, সিদ্ধান্তটি তার নিজের কি না।

আমাদের সমাজে প্রায়ই দেখা যায়, নারীদের জীবনের মূল্যায়ন করা হয় অন্যের চোখ দিয়ে। কেউ বিয়ে না করলে প্রশ্নের মুখোমুখি হন, কেউ সন্তান না নিলে সমালোচিত হন, কেউ চাকরি করলে বলা হয় সংসার সামলাতে পারছেন না, আবার কেউ চাকরি না করলে বলা হয় তিনি যথেষ্ট উচ্চাকাঙ্ক্ষী নন। এই ধরনের বিচার আসলে মানুষের নিজস্ব বাবল থেকে তৈরি হয়, যেখানে তারা মনে করেন তাদের জীবনযাপন পদ্ধতিই সবার জন্য আদর্শ।

বাস্তবতা হলো, পৃথিবী অনেক বড়, অনেক বৈচিত্র্যময়। একজন নারীর অভিজ্ঞতা কখনোই সকল নারীর অভিজ্ঞতার প্রতিনিধিত্ব করে না। একই সমাজে, একই পরিবারে বড় হওয়া দুই বোনের জীবনও সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে। তাই নিজের অভিজ্ঞতাকে মূল্য দেওয়ার পাশাপাশি অন্যের অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতাকেও বোঝার চেষ্টা করা জরুরি।

পৃথিবী কোনো ছোট্ট পিং-পং বলের মতো সীমাবদ্ধ নয়। এটি অসংখ্য রঙ, সংস্কৃতি, স্বপ্ন, সংগ্রাম এবং সম্ভাবনার সমন্বয়ে গঠিত। নিজের বাবলের বাইরে এসে যখন আমরা অন্যের জীবন, অন্যের অভিজ্ঞতা এবং অন্যের সংগ্রামকে দেখার চেষ্টা করি, তখনই আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারিত হয়। আর এই প্রসারিত দৃষ্টিভঙ্গিই নারী অধিকার, মানবাধিকার এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের ভিত্তি তৈরি করে।

একজন নারী বা পুরুষের প্রকৃত শক্তি শুধু নিজের জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়ার মধ্যে নয়, বরং অন্যের ভিন্ন সিদ্ধান্তকেও সম্মান করার মধ্যেও নিহিত। কারণ স্বাধীনতা তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হয়।

[ফেমিনিস্ট ফ্যাক্টরে প্রকাশিত কলাম লেখকের নিজস্ব বক্তব্য]

Leave a Reply