শব্দ বেশি, গভীরতা কম: আমাদের রাজনীতি ও ধর্মচর্চা
ইকরামুল শামীম ।। ‘খালি কলস বাজে বেশি’ প্রবাদটি মানুষের অসারতা ও জাহির করার প্রবণতাকে নির্দেশ করে। গভীরতাহীন জ্ঞান, যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার অভাব ঢাকতেই মানুষ স্বভাবগতভাবে বেশি কোলাহল তৈরি করে। যার ভেতরে সত্যিকারের জ্ঞানের সঞ্চয় বা গুণ রয়েছে, সে সবসময় শান্ত, সংযত ও বিনয়ী থাকে। যেমন জলে পূর্ণ কলস থেকে কোনো বাড়তি শব্দ বের হয় না, ঠিক তেমনি একজন রুচিশীল ও সুপণ্ডিত ব্যক্তি নিজের ঢোল নিজে পেটান না। এর বিপরীতে অল্পজ্ঞানের অধিকারীরা নিজেদের ক্ষমতা ও শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করার জন্য সর্বদা উচ্চকণ্ঠে কথা বলে এবং সমাজে নিজেদের বড় প্রমাণের ব্যর্থ চেষ্টা চালায়।
বর্তমান সময়ে আমাদের সামাজিক জীবন থেকে শুরু করে জনপরিসর – সবখানেই এই ‘খালি কলস’ মারফতের মানুষের কোলাহল সবচেয়ে বেশি কানে আসে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে এই প্রবণতা এক নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে। মানুষ এখন যেকোনো বিষয়ের গভীরে না গিয়েই পণ্ডিতের মতো মন্তব্য করতে ভালোবাসে। বই পড়ার অভ্যাস বা কোনো বিষয় নিয়ে গভীরভাবে অনুধাবনের ধৈর্য এখন অধিকাংশের মাঝেই অনুপস্থিত। অথচ না জেনেই নিজের মতকে সবার ওপরে স্থান দেওয়ার এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা প্রতিটি ক্ষেত্রে দেখা যায়। অসার কথা ও ভুয়া জ্ঞান বিলিয়ে নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ করার এই চেষ্টা বস্তুত তাদের অভ্যন্তরীণ শূন্যতাকেই প্রকাশ করে দেয়।
রাজনীতিতে এই খালি কলসের বাজনার প্রভাব সবচেয়ে প্রকট ও দৃশ্যমান। আজ রাজনীতির মাঠে দেশ গঠন বা জনকল্যাণের গভীর চিন্তার চেয়ে উচ্চবাচ্য ও সস্তা আস্ফালনের চর্চা বেশি হয়। একজন আদর্শ রাজনীতিবিদের মূল শক্তি হওয়ার কথা ছিল তার নীতি, দর্শন ও দূরদর্শিতা। অথচ বর্তমানে অনেকেই প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করতে কিংবা সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করতে ফাঁপা বুলি ও চটকদার বক্তব্যের আশ্রয় নেন। নিজেদের গঠনমূলক কোনো কাজের ইতিবাচক রিপোর্ট না থাকলেও তারা মাইকের সামনে সবচেয়ে বেশি চিৎকার করেন। রাজনৈতিক মঞ্চে যে যত বেশি উচ্চকণ্ঠে প্রতিপক্ষকে গালি দিতে পারেন, তাকে তত বড় নেতা মনে করার এক অপসংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, যা মূলত রাজনীতিতে প্রজ্ঞার শূন্যতাকেই তুলে ধরে।
বর্তমান রাজনীতিতে যোগ্য ও মেধানিভর নেতৃত্বের অভাব তৈরি হওয়ার কারণেই এই গোলমাল এত বৃদ্ধি পেয়েছে। গভীর চিন্তা ও জনহিতকর পরিকল্পনা করার মতো রাজনৈতিক জ্ঞান যাদের নেই, তারাই মূলত জনসমক্ষে বেশি হট্টগোল তৈরি করে। তারা চান তাদের অসার যুক্তি ও ফাঁপা বক্তব্য দিয়ে দেশের মূল সমস্যাগুলোকে আড়াল করতে। জনগণের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের মতো মৌলিক দাবিগুলো সমাধান করার ক্ষমতা বা সদিচ্ছা না থাকলে কেবল মুখে ক্ষমতার দাপট দেখানো সহজ পথ হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু ইতিহাস বলে, কেবল ফাঁপা বাকপটুতা দিয়ে কোনো জাতি সমৃদ্ধ হতে পারে না, তার জন্য প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন কাজ ও গভীর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা।
ধর্মের মতো সংবেদনশীল ও পবিত্র ক্ষেত্রেও ‘খালি কলস বাজে বেশি’র প্রতিফলন অত্যন্ত হতাশাজনকভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে। ধর্মের প্রকৃত অর্থ হলো আত্মশুদ্ধি, মানবসেবা, বিনয়, ধৈর্য ও স্রষ্টার প্রতি চরম সমর্পণ। একজন সত্যিকারের ধার্মিক মানুষের হৃদয় হয় গভীর সমুদ্রের মতো শান্ত ও সহনশীল। অথচ বর্তমানে ধর্ম নিয়ে সবচেয়ে বেশি উচ্চবাচ্য করেন তারা, যাদের ধর্মীয় মৌলিক জ্ঞান ও আধ্যাত্মিক চেতনার প্রচণ্ড ঘাটতি রয়েছে। ধর্মের বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠান ও লেবাসকে পুঁজি করে তারা নিজেদের সবচেয়ে বড় ধার্মিক হিসেবে জাহির করতে ভালোবাসেন, অথচ তাদের চালচলনে বা আচরণে ধর্মীয় অনুশাসনের কোনো গভীর ছাঁপ থাকে না।
ধর্মীয় চর্চায় আত্মশুদ্ধির চেয়ে প্রদর্শনকামিতা ও কোলাহল এখন অনেকাংশে প্রাধান্য পাচ্ছে। স্বল্পজ্ঞানের অধিকারী ব্যক্তিরা ধর্মের অন্তর্নিহিত রূপ ও পরম করুণাময়ের দয়ার কথা প্রচার করার বদলে ধর্মকে কেবল বিতর্ক ও বিভাজনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অন্যের ধর্ম বিশ্বাসকে ছোট করা কিংবা সহিষ্ণুতার নীতি ভুলে চরমপন্থার কথা বলা এই খালি কলসের দলেরই কাজ। তারা মনে করেন, উগ্র বক্তব্য ও উচ্চকণ্ঠে অন্যকে কাঠগড়ায় দাঁড় করালেই ধর্মের সেবা হয়, অথচ এর মাধ্যমে তারা যে ধর্মের ভাবমূর্তিই ক্ষুণ্ন করছেন তা তাদের বোধগম্য হয় না।
রাজনীতি ও ধর্মের মতো গুরুত্বপূর্ণ দুটি খাতে যখন জ্ঞানহীন ও ফাঁপা মানুষের কর্তৃত্ব বৃদ্ধি পায়, তখন পুরো সমাজ বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে যায়। সাধারণ মানুষ প্রায়শই এদের চটকদার কথা ও চিৎকার দেখে মূল পথ থেকে বিচ্যুত হয়। কারণ খালি কলসের বাজনা এত বেশি বিকট হয় যে, প্রকৃত জ্ঞানী ও সত্যনিষ্ঠ মানুষের মৃদু অথচ প্রজ্ঞাপূর্ণ কণ্ঠস্বর সেই কোলাহলে চাপা পড়ে যায়। সমাজে যখন গভীর চিন্তাশীল মানুষের চেয়ে খালি কলসের ন্যায় ফাঁপা আওয়াজকারীদের বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, তখন যুক্তিবোধ, নৈতিকতা ও সঠিক দিকনির্দেশনা হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়।
এই অসারতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার প্রথম পদক্ষেপ হলো ব্যক্তিপর্যায়ে সচেতনতা ও প্রকৃত শিক্ষার বিস্তার ঘটানো। আমাদের অনুধাবন করতে হবে যে, উচ্চকণ্ঠ কখনো সত্য বা যোগ্যতার মাপকাঠি হতে পারে না। ধর্ম ও রাজনীতি উভয় ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তির বাহ্যিক কোলাহল বা ফাঁপা বুলি দেখে তাকে মূল্যায়ন করা বন্ধ করতে হবে। তার কাজের গভীরতা, তার জ্ঞান ও তার আচরণের বিনয় দেখে তার প্রকৃত যোগ্যতা বিচার করা জরুরি। সমাজ যদি সস্তা আস্ফালনকে প্রশ্রয় না দিয়ে গভীরতা ও মেধাকে সম্মান জানাতে শেখে, তবেই খালি কলসের বাজনা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমে আসবে।
প্রকৃত জ্ঞানী ও যোগ্য মানুষদের নীরবতা ভেঙে সত্যের পক্ষে সোচ্চার হওয়া এখন সময়ের দাবি। শূন্য কলসের আওয়াজে সমাজ যখন বিভ্রান্ত হতে থাকে, তখন পূর্ণ কলসের শান্ত অথচ দৃঢ় উপস্থিতি অত্যন্ত প্রয়োজন। তরুণ প্রজন্মকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে যেন তারা কেবল বাকপটুতা বা বাহ্যিক প্রদর্শনীতে মুগ্ধ না হয়ে বিষয়গুলোর গভীরে পৌঁছাতে চেষ্টা করে। ধর্মীয় ক্ষেত্রে প্রকৃত আধ্যাত্মিকতা ও নীতিবোধের চর্চা এবং রাজনীতির ক্ষেত্রে জনকল্যাণমুখী ভাবনার বিকাশই পারে এই ফাঁপা আড়ম্বরকে সমাজ থেকে দূর করতে।
পরিশেষে বলা যায়, কলসের জল যেমন তাকে পূর্ণতা ও স্থায়িত্ব দেয়, ঠিক তেমনি জ্ঞান, বিনয় ও কর্মই মানুষের ব্যক্তিত্বের মূল ভিত্তি। খালি কলস সাময়িকভাবে বিকট শব্দ তৈরি করে অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার কোনো স্থায়িত্ব বা মূল্য থাকে না। রাজনীতি ও ধর্মের মতো স্পর্শকাতর স্থানে ফাঁপা বুলির বদলে কাজের গভীরতা ও নীতিপরায়ণতার চর্চা প্রতিষ্ঠা করাই একটি সুস্থ ও প্রগতিশীল সমাজের লক্ষণ। আমাদের সবাইকে বাহ্যিক এই গোলমালে বিভ্রান্ত না হয়ে গভীর চিন্তা, জ্ঞান ও সত্যের পথেই ধাবিত হতে হবে।
ইকরামুল শামীম : সমাজকর্মী ও আইন পরামর্শক
[ফেমিনিস্ট ফ্যাক্টরে প্রকাশিত মুক্তমত লেখকের নিজস্ব বক্তব্য]

