October 15, 2026
ফিচার ১জীবনের গল্প

বনি ও ফ্রেড এবং শিখা: বাংলাদেশের বন্ধু, বাংলাদেশের কন্যা 

ড. মাহমুদ হাসান ।। কয়েকদিন আগে অটোয়া থেকে ৮০ কিলোমিটার দূরে ম্যাক্সভিলে অবস্থিত চাইল্ড হ্যাভেন ইন্টারন্যাশনালে গিয়েছিলাম বনি ক্যাপুচিনোর সাথে দেখা করে তাকে বাংলাদেশিদের পক্ষ থেকে সম্মাননা স্মারক দিতে।

ফ্রেড ক্যাপুসিচিনো ও বনি ক্যাপুচিনো বা বনিয়াম্মার (তাদের ২১ জন সন্তান তাকে বনিয়াম্মা ডাকে) জন্য একটা স্মারক এবং ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের যুদ্ধশিশু ও তাঁদের দত্তক মেয়ে শিখা ক্যাপুচিনোর জন্য একটা স্মারক করেছিলাম এ বছর আমাদের স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে তাদেরকে দেওয়ার জন্য। কিন্তু ফ্রেড অসুস্থ থাকার কারণে আমাদের সেই অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পারেননি। এরপর একবার তাঁদের হাতে ক্রেস্ট দু’টো দিতে চাইল্ড হ্যাভেনে যাওয়ার কথা থাকলেও ফ্রেডের শারীরিক অবস্থা আরো খারাপ হয়ে যাওয়ায় আর হয়ে ওঠেনি। ১০০ বছর ৮ মাস বয়সে ফ্রেড মারা গেলেন ২০২৬ আগস্টের ৬ তারিখে।

১৯৭১ সালের ৯ মাসের যুদ্ধে পাকিস্তান মিলিটারি ও এদেশীয় রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস নামের প্যারামিলিটারি বাহিনী আড়াই লাখ থেকে সাড়ে চার লাখ নারী ও শিশুকে তাদের বাড়িতে এবং ক্যাম্পে তুলে নিয়ে “হেরেমখানা” বানিয়ে দিনের পর দিন যৌন নির্যাতন করে। নির্যাতিত সেইসব নারীকে “বীরাঙ্গনা” উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

১৯৭২ সালের বিভিন্ন সময়ে গর্ভবতী নারীরা একের পর এক শিশু জন্ম দিতে থাকেন। তাদের জন্য সরকার বিভিন্ন নারী বা মহিলাসদন ও শিশুসদন তৈরি করে। এইসব নির্যাতিত নারীদের গর্ভে হাজার হাজার সন্তান জন্মগহণ করে। সেসব শিশুদের বলা হয় যুদ্ধশিশু।

পাকিস্তানি মিলিটারি ও রাজাকার, আল-বদর ও আল শামসের হিংস্র সদস্যদের ধর্ষণের ফলে গর্ভবতী হওয়া নারীদের বেশিরভাগকে সমাজ গ্রহণ করেনি। তাদের সন্তানদের তো নয়ই। নির্যাতিত বীরাঙ্গনা ও যুদ্ধশিশুরা হয়ে পড়েন সমাজের বোঝা।

কানাডা, আমেরিকা, ইউরোপ,জাপান থেকে প্রচুর মানুষ যুদ্ধশিশুদের দত্তক নিতে আগ্রহী হন। যেহেতু ইসলাম ধর্মে দত্তকের বিধান ছিল না, সেহেতু বঙ্গবন্ধুর বিশেষ নির্দেশে যুদ্ধশিশুদের বিদেশি সেসব মানুষের জন্য দত্তকের ব্যবস্থা করে সরকার।

সেরকম এক দম্পতি কানাডা থেকে বাংলাদেশে যান এবং ১৫ জন যুদ্ধশিশুকে কানাডা নিয়ে যেতে চান। সেই দম্পতির নাম বনি ক্যাপুচিনো ও ফ্রেড ক্যাপুচিনো। তারা ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ থেকে “Friends for the Families in Canada” নামের সংস্থার অধীনে ১৫ জন যুদ্ধশিশু নিয়ে আসেন কানাডাতে। একসাথে এতোজন যুদ্ধশিশু আর কেউ নিতে পারেনি। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে দত্তকের বিধান ছিল না। ফ্রেড ও বনির ১৫ জন যুদ্ধশিশুর জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার আইন করে যুদ্ধশিশুদের উন্নত বিশ্বে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেন।

বনি ও ফ্রেড ক্যাপুচিনোর কানাডায় নিয়ে আসা ১৫ জন যুদ্ধশিশুর মধ্যে একজন শিশুকে নিজেদের কাছে রাখেন। সেই যুদ্ধশিশুর নাম শিখা ক্যাপুচিনো। শিখা বেড়ে উঠেছেন বনি ও ফ্রেডের আরো বিশজন সন্তানের সাথে। বনি ও ফ্রেডের দুইজন গর্ভজাত সন্তান। বাকি ১৯ জনই বিভিন্ন দেশ, বিশেষ করে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ থেকে দত্তক নেওয়া।

 

এ বছর ১৭ই জানুয়ারি ছিল বাংলাদেশের বন্ধু ফ্রেড ক্যাপাচিনোর ১০০ তম জন্মদিন। ১৯২৬ সালের এই দিনে এই মহান ব্যক্তি আমেরিকায় জন্ম নেন। ১০০ বছর বয়সের ফ্রেড ও তার ৯১ বছর বয়স্ক বনি ক্যাপাচিনোর জীবন পুরোটাই আননন্দময় ছিল। এতো পরিপূর্ণ জীবন পৃথিবীতে খুব কম মানুষেরই হয়। তারা যা করতে চেয়েছেন তা করতে পেরেছেন, সেটা আমি তাদের দুইজনকে একসাথে পেয়েই বুঝেছি। আমার সাথে যারাই তাদের সান্নিধ্য পেয়েছে, সবাই বুঝেছে।

১৯৫৩ সালে ফ্রেড আর বনি বিয়ে করেন। ১৮ বছরের বনির চোখে তখন নানাবিধ স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন শুধুই বড় থেকে বড় হয়ে আকাশ ছাড়িয়ে গেছে। বনির এই আকাশ সমান স্বপ্নের প্রায় সবই পূরণের সারথী হিসেবে পেয়েছিলেন ফ্রেড নামের একজন মহান মানুষকে। যে কারণে তাদের জীবন কানায় কানায় পূর্ণ। ১৯৫৫ সালে নিজেদের সন্তান রবিনের জন্মের পর থেকে পরের ২৬ বছরে (১৯৮১ সাল পর্যন্ত) তাদের ঘরে এসেছে নিজেদের দুই সন্তানসহ সব মিলিয়ে ২১ জন সন্তান। সেই সন্তানদের তালিকায় বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, শ্রীলংকা, ভিয়েতনাম, কোরিয়া, আফ্রিকা, ইস্ট ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশ থেকে সন্তান দত্তক নিয়েছেন। তারা বর্ণবাদ বিরোধী। তারা গান্ধীর হিংসাহীন প্রিন্সিপল মেনে চলে আসছেন সারাজীবন। এক বাড়িতে মিনিমালিস্টভাবে বড় করেছেন ২১ সন্তানকে। ফার্মিং করে সন্তানদের পড়ালেখা করিয়েছেন, সুন্দর জীবন দিয়েছেন ক্যাপাচিনো দম্পতি।

আমি ফ্রেডকে চিনি ২০১৩ সাল থেকে। তখন শাহবাগ আন্দোলন চলে। বিশ্বব্যাপি ছড়িয়ে পড়া শাহবাগ আন্দোলনের সাথে আমিও সলিডারিটি ইভেন্ট আয়োজন করি। বীরাঙ্গনা ও যুদ্ধশিশু নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে দেখলাম ১৯৭২ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত সময়ে কানাডায় বেশ কিছু যুদ্ধ শিশু এসেছিল।

আরো একটু গবেষণা করতেই ফ্রেড আর বনির ব্যাপারে জানলাম। জানলাম যে এই দম্পতি বাংলাদেশ থেকে ১৫ জন যুদ্ধশিশু কানাডাতে আনতে সাহায্য করেছিলেন। সেই ১৫ জনের ১৪ জন কানাডার বিভিন্ন পরিবারে জায়গা পেয়েছে। শিখা নামের ফুটফুটে কন্যাসন্তানকে নিজেদের সন্তান হিসেবে রেখে দেন।

২০১৩ সালেই টরন্টো থেকে কয়েকজন সহযোদ্ধা অটোয়া আসে এবং এরপর আমরা ফ্রেড-বনির প্রতিষ্ঠান চাইল্ড হ্যাভেন ইন্টারন্যাশনালে (১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠা করেন) যাই। ফ্রেড আমাদের সাথে এমন সৌহার্দ্যপূর্ণভাবে কথা বলেছিলেন যে তার সম্পর্কে উচ্চ ধারণা পোষণ না করে পারা যায়নি। তার জীবনের গল্প, সন্তান অ্যাডপ্ট করার গল্প, বাংলাদেশ থেকে যুদ্ধশিশু আনার গল্প আমাদের শুনিয়েছিলেন।

সেই সময় বনিআম্মা গিয়েছিলেন ভারত আর নেপালে চাইল্ড হ্যাভেনের শিশুদের সাথে দেখা করতে। বাংলাদেশের চট্টগ্রামে শিশুস্বর্গ বা চাইল্ড হ্যাভেনে ছিন্নমূল শিশু আছে। ফ্রেড আর বনি দম্পতি ৪০ বছর ধরে শত শত শিশুকে সাহায্য করেছেন। ১৯ জন শিশু দত্তক নেওয়া, তাদেরকে মানুষের মতো মানুষ করা, আজীবন বঞ্চিত শিশুদের নিয়ে কাজ করা, এসবই বনিয়াম্মার উদ্যোগ, তাও জানালেন।

গত বছর এপ্রিল মাস থেকে শুরু করে ফ্রেডের সাথে দেখা করতে যাওয়ার জন্য তোরজোড় শুরু করলাম। কিন্তু ফ্রেড ছিল হাসপাতালে। পাক্কা তিন মাস হাসপাতালে থাকার পর একদিন তিনি চাইল্ড হ্যাভেনে বা বাড়িতে ফিরলেন। পরের দিনই ইমরান আর মামুনভাইকে নিয়ে চলে গেলাম। এবার ফ্রেড আর বনি দুইজনকেই একসাথে পেলাম। এবার আমরা গল্প করলাম। জানলাম জানুয়ারির ১৭ তারিখে তার ১০০ বছর হবে এবং এও জানালেন যে তার গড়ে তোলা ফার্স্ট ইউনিটারিয়ান ইউনিভার্সালিস্ট তার শতবর্ষ উদযাপন করবে। আমরাও আমন্ত্রিত। এই দুইজনকে এতো আপন কেন লাগে, জানি না। একদম মাটির মানুষ!

এর মধ্যে ফ্রেড আমাদের জানালো শিখা অটোয়া থেকে আসবে। আমরা আসছি শুনে ফ্রেডই শিখাকে আসতে বলেছে। আমরা বের হবো হবো করছি, তখনি শিখা এসে হাজির হলেন। আগেই বলেছি যে শিখা একজন যুদ্ধশিশু। সে সুখে আছে। ক্যাটারিনা আর কার্মা নামের দুইজন কন্যার সুখি মা সে। মনোয়ার ক্লার্ক যেমন বাংলাদেশের ব্যাপারে প্রচুর আগ্রহী (এখনো আমাকে হোয়াটসঅ্যাপে, মেসেঞ্জারে বাংলাদেশে কি হচ্ছে জানতে চান, ওর পারস্পেকটিভ শেয়ার করেন), শিখাকে তেমন আগ্রহী মনে হলো না। পরে শিখাই আমাকে একদিন জানিয়েছে, বাংলাদেশের ব্যাপারে আসলে তার ভিতরে একটা ট্রমা কাজ করে।

২০১৩ সালে এবং গত বছর ফ্রেডের সাথে আলোচনায় তিনি বঙ্গবন্ধুর অবদানের কথা বলেন। বঙ্গবন্ধু যদি সেসময়ে যুদ্ধশিশুদের জন্য প্রশাসনিক জটিলতাকে ফাস্ট ট্র‍্যাক করার আদেশ না দিতেন তাহলে ফ্রেড ও বনি ১৫ জন যুদ্ধশিশু কানাডায় আনতে পারতেন না। এরপর আরো বিভিন্ন দেশ থেকে অনেকেই বাংলাদেশের যুদ্ধশিশু উন্নত বিশ্বে নিয়ে আসেন।

ফ্রেডবিহীন বনিয়াম্মার সাথে এদিন আলোচনায় যখন আফসোস করে বললাম যে বাংলাদেশের সরকার ও অটোয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশন কোনোদিন এই দম্পতিকে কোনোরকম সম্মাননা কেন যে দেয়নি, তখন বনি বঙ্গবন্ধুর ভূমিকার কথা স্মরণ করেন। আমি এই প্রসঙ্গ আসলেই লজ্জিত হয়েছি।

কানাডার চিকিৎসক হালকে ফেরি নিয়ে আসেন মনোয়ারা ক্লার্ককে। মনোয়ারার সাথে আমার দুইবার দেখা হয়েছে। ২০১৫ সালের কোনো একদিন ভ্যাংকুভারের এক কফি শপে আমার স্ত্রীসহ মনোয়ারার সাথে কথা বলছিলাম, বুঝেছিলাম আমাদের এই বোন খুব এক মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন।

২০১৩ সালের শাহবাগ আন্দোলন ঘটার কারণে বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের খবর সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। তখন থেকে তিনি সারাক্ষণ খবর নিতেন। এই আন্দোলনে জড়িত হতে বাংলাদেশের অনেকের সাথেই পরিচয় হয় তার।

এরপর ২০১৪ সালে তিনি বাংলাদেশে গিয়েছিলেন। তাঁর মাকে খুঁজেছেন। চেষ্টা করেছেন সরকারের দায়িত্বশীল কারো সাথে দেখা করে জন্মসনদের ব্যবস্থা করবেন। পাকিস্তানি আর্মিরা তার মাকে বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে মারলে, সেই ক্ষতচিহ্ন নিয়ে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। সেদিন মনোয়ারা আমাদেরকে সেই ক্ষতচিহ্ন দেখালেন। তিনি আফসোস করে বলছিলেন যে তার কোমরের কাছে বেয়োনেটের দাগকেই তিনি জন্মসনদ হিসেবে মনে করেন। এরপর তিনি ২০১৬ সালে আবার যখন দেশে গেলেন তখন আমার সাথে দেখা করলেন।

শিখা ক্যাপুচিনোর সাথে আমার বেশ কয়েকবার কথা হয়েছে। তিনি ভীষণ অভিমান করে আছেন। আমাকে বলছিলেন যে তিনি বাংলাদেশের সাথে কোনো কানেকশন ফিল করেন না। কোনোদিন বাংলাদেশের কোনো সরকার খোঁজ নেয়নি যে যেসব যুদ্ধশিশুকে বিদেশে পাঠিয়ে দিয়েছেন তারা কেমন আছে, তারা দেশে ফিরতে চায় কিনা! শিখা আরো বলছিলেন যে তার বেশ কয়েকবার প্রশ্ন জেগেছে যে তিনি যেখান থেকে এসেছেন সেই জায়গা দেখতে কেমন, যার পেটে জন্মেছেন তিনি বেঁচে আছেন কি না, জানতে চেয়েছেন। শিখা বলছিলেন যে বাংলাদেশ সরকার কি পারতো না যেসব যুদ্ধশিশু বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে আছে তাদেরকে একসাথে আমন্ত্রণ জানিয়ে দেশটাকে ঘুরিয়ে দেখার ব্যবস্থা করতে? সকল যুদ্ধশিশুকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও দেশের অবস্থা সম্পর্কে জানাতে?

শিখা ভীষণ অভিমান করেছেন। আমাকে বলেছেন যে ফ্রেড ও বনিই তার সমস্ত সত্তা। তারাই তার বাবা-মা। বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানের দুইদিন আগেও শিখা বলেছিলেন যে তিনি শুধুমাত্র তার বাবা-মাকে ড্রাইভ করে নিয়ে যাবেন। কোনোরকম সম্মাননা তিনি চান না। অনুষ্ঠানেও নাও থাকতে পারেন বলে জানালেন।

কিন্তু সেটা ছিল তার অভিমান। আমি বারবার শিখার কাছে ক্ষমা চেয়েছি। তিনি শুধু আমাকে বলছিলেন যে আমি যেন এভাবে ক্ষমা না চাই। এটা সরকারের ব্যর্থতা। যাই হোক, শিখা, বনি, ফ্রেড অনুষ্ঠানে আসতে পারেননি বলে তখন আর সম্মাননা নেওয়া হয়নি।

বনির সাথে দেখা হওয়ার দিন দেখা হলো শিখার আরেক দত্তক বোন অ্যানির সাথে। অ্যানি এখন থাকেন আমেরিকার রোড আইল্যান্ডে। সেখান থেকে ড্রাইভ করে বনিয়াম্মাকে দেখতে এসেছেন। বনি ও ফ্রেড অ্যানিকে দত্তক নিয়েছিলেন কোরিয়া থেকে। ফ্রেড মারা যাওয়ার পর ৯১ বছর বয়স্ক বনিয়াম্মাকে তাদের সন্তানেরা পালা করে দেখাশুনা করছেন।

এ বছর জানুয়ারিতে ফ্রেডের ১০০ বছর হয়েছিলেন। বেশ জাকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান করে তা আয়োজিত হয়েছিল। আমার দুই বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে সেই জন্মদিনের অনুষ্ঠানে আয়োজকদের সাহায্য করার সুযোগ হয়েছিল। আমি ফ্রেডকে তখন শুভেচ্ছা জানাতে বলেছিলাম যেন ফ্রেড আরো অনেক বছর বাঁচেন।

সেই অনুষ্ঠানেই ফ্রেড, বনিয়াম্মা ও শিখাকে আমাদের স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে স্পেশাল গেস্ট হিসেবে দাওয়াত দিয়েছিলাম। বাংলাদেশিদের পক্ষ থেকে প্রথমবারের জন্য সম্মাননা দেওয়ার ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলাম। আমরা সম্মাননা স্মারক বানালাম। তাদেরকে উদ্দেশ্য করে অনুষ্ঠান সাজালাম। কিন্তু আগেরদিন বনিয়াম্মা ফোন করে জানালেন যে ফ্রেডের অসুস্থতার কারণে তারা আসতে পারবেন না। পরে আবার চাইল্ড হ্যাভেনে যাওয়া ক্যান্সেল হওয়ায় ফ্রেডকে আমরা আর পেলাম না। এটা আমাদের জন্য বিশাল এক আফসোস যে আমাদের পক্ষ থেকে একসাথে দুইজনকে সম্মাননা দিতে পারলাম না।

যাই হোক, এদিন বনিয়াম্মা ও আমি অনেক কথা বলেছি। বনিয়াম্মা এরকম সম্মাননা পেয়ে অনেক খুশি হয়েছেন। কাজের কারণে শিখা আসতে পারেননি। এক ঘণ্টা আড্ডা শেষে ফেরার সময় শিখার সাথে ফোনে কথা হয়েছে এবং তাকে জানিয়েছি যে তার সম্মাননাটা তার বনিয়াম্মার কাছে রেখে এসেছি। তিনি ধন্যবাদ জানিয়েছেন। এনি ও বনিয়াম্মা দুইজনেই বলছিলেন যে শিখা এটা দেখে ভীষণ খুশি হবেন। শিখার সাথে শিগ্রিই দেখা করবো।

এই দুইজন মানুষকে আমার হিংসা হয়। কি অসামান্য জীবন যাপন করেছেন! ফ্রেড আর বনির স্বার্থহীন কাজ সবসময় স্মরণ করবে মানুষ। তাদের দুইজনের কাছে বাংলাদেশ ঋণী। কিন্তু তারা কোনোদিন বাংলাদেশের কাছ থেকে কোনোরকম সম্মাননা পাননি। কিন্তু আমি, আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে ফ্রেড আর বনি ক্যাপাচিনোকে “ফ্রেন্ডস অব বাংলাদেশ” এবং শিখাকে “চাইল্ড অব বাংলাদেশ” সন্মাননা দিব।

বাংলাদেশ সরকার কোনোদিন এই দম্পতিকে নিয়ে ভাবেনি। শিখা ক্যাপুচিনোসহ শত শত যুদ্ধশিশুকে নিয়েও ভাবেনি। কিন্তু আমরা ইতিহাসের একটা অংশ হয়ে রইলাম। অন্তত বনিয়াম্মা, ফ্রেড ও শিখার কাছে। এটাতেই আত্মতুষ্টি আমাদের।

বনি ক্যাপুচিনো ও ফ্রেড ক্যাপুচিনোর প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালবাসা।

 

ড. মাহমুদ হাসান
সহযোগী অধ্যাপক
আইন বিভাগ, কার্লটন ইউনিভার্সিটি
অটোয়া, কানাডা

Leave a Reply