March 7, 2026
ফিচার ২মুক্তমত

এদেশের নারীরা এখন সবচেয়ে বড় পরাজিত পক্ষ

কানিজ ফাতেমা ।। বাংলাদেশের ইতিহাসে অনেক আন্দোলন হয়েছে। সরকার গেছে, সরকার এসেছে। কিন্তু ২০২৪ সালের তথাকথিত “গণঅভ্যুত্থান” – এর পর যে বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, তা যদি একবাক্যে বলতে হয়, তবে সেটি দাঁড়ায় – নারীর বিরুদ্ধে এক নীরব যুদ্ধ। রাষ্ট্র দুর্বল হলে এর প্রথম আঘাতটা আসে নারীর ওপর – এই তত্ত্ব নতুন নয়।
৫ই আগস্ট পরবর্তী দেশজুড়ে যে নিরাপত্তাহীনতা, বিচারহীনতা,আইনশৃঙ্খলার শূন্যতা তৈরি হয়েছে তার প্রথম এবং সবচেয়ে বেশি শিকার হয়েছে নারী ও কন্যাশিশুরা। গত ১৭ মাসের অভিজ্ঞতা আমাদের সামনে একটি ভয়াবহ সত্য উন্মোচন করেছে – ধর্ষণ এখন আর বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়,বরং নিত্যদিনের স্বাভাবিক রুটিনে পরিণত হয়েছে। যৌন সহিংসতা তীব্রভাবে বেড়েই চলেছে। স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে নারী হেনস্তা। আরো ভয়াবহ বিষয় হলো, হেনস্তাকারী ও ধর্ষকদের প্রকাশ্যে সামাজিক বৈধতা দেওয়া হচ্ছে। ফুলের মালায় বরণ করে নেওয়া হচ্ছে। এ এক ভয়াবহ চিত্র, ভিন্ন বাংলাদেশের চিত্র! যখন ফুলের মালা অপরাধীর গলায় পড়ে, তখন সেই মালা আসলে রাষ্ট্রের গলায়ই পড়ে। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন উন্মত্ততা নয়; এটি একটি গভীর সামাজিক ও রাজনৈতিক বিপর্যয়ের লক্ষণ। বিগত সরকারের সময়ে ধর্ষণ হয়নি এমনটি বলছি না, কিন্তু ধর্ষণ বা নৃশংস ঘটনার পর রাষ্ট্রকে নীরব থাকতে দেখা যায়নি। রাষ্ট্র নড়ত, প্রশাসন চাপে পড়তো, বিচার-প্রক্রিয়া শুরু হতো। এসবই ছিল দৃশ্যমান। “জিরো টলারেন্স” রাজনৈতিকভাবে উচ্চারিত হতো, যা অপরাধীকে ভয় দেখাতো। শেখ হাসিনার শাসনকালে নারীদের নিরাপত্তা বিষয়ে তুলনামূলকভাবে অনেক সচেতনতা ছিল। এ সত্য অস্বীকার করা রাজনৈতিক প্রতারণা। ২০১৪-২০১৯ সালের মধ্যে আইন প্রয়োগে কিছু কার্যকর উদাহরণ দেখা গিয়েছিল। ধর্ষণ বা হেনস্থার ঘটনায় দ্রুত তদন্ত এবং সরকারি পর্যায়ে নজরদারি ছিল। তখন নারী নির্যাতন বিষয়ে জাতীয় সচেতনতা তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্ন। তথাকথিত অভ্যুত্থানের পর পরিস্থিতি অনেকটা উল্টোপথে হাঁটা শুরু করেছে। নারীরা এখন সবচেয়ে বড় পরাজিত পক্ষ। ২৪-এর জঙ্গি উত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে নারীর নিরাপত্তা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতা শুধু বাড়ছেই না,বরং একটি উচ্চমাত্রার স্থিতিশীলতায় পৌঁছে গেছে।

পরিসংখ্যান ঘাটলে দেখা যাবে ২০২৪-২০২৫ এর মধ্যে ধর্ষণ মামলা হয়েছে ৪০০০ এর বেশি। শিশুদের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতার মামলা হয়েছে ৩০০ এর বেশি। ২০২৬ এর মাত্র শুরুতে, জানুয়ারি মাসে একাধিক ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের ঘটনা ঘটেছে। বাস্তব চিত্র পরিসংখ্যানের চেয়েও ভয়াবহ। The Daily Star-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ধর্ষণের ঘটনা প্রায় ৬৮% বৃদ্ধি পেয়েছে,আর শিশু ধর্ষণের ঘটনা একই সময় প্রায় ৭৫% বেড়েছে। এগুলো কেবল সংখ্যা নয়, ভেঙে পড়া রাষ্ট্রব্যবস্থার দলিল; এটি রাষ্ট্র ও সমাজের এক বিস্তৃত ব্যর্থতার প্রতিফলন, যেখানে অপরাধীরা আইনকে এড়িয়ে যায় এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি তাদের জন্য আশ্রয় হয়ে উঠেছে। এই পরিস্থিতি এমন এক অবস্থার জন্ম দিয়েছে যেখানে নারীর প্রতি সহিংসতা এখন প্রায় নিত্যদিনের ভয় এবং অনিশ্চয়তার অংশ।

এই জঙ্গি উত্থান-পরবর্তী সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিবর্তন নারীবিরোধী শক্তির প্রকাশ্যে উত্থান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বেগম রোকেয়ার গ্রাফিতিতে কালি মেখে দেওয়া হয় রাষ্ট্র তখনও চুপ। রাজু ভাস্কর্যের সামনে প্রকাশ্যে নারীর কুশপুত্তলিকায় জুতাপেটা করে উগ্রবাদীরা; রাষ্ট্র তখনও চুপ। যারা এক সময় প্রান্তে ছিল, আজ তারা কেন্দ্রে। মৌলবাদী ও নারীবিদ্বেষী শক্তির উত্থানেও রাষ্ট্রের নীরব নির্লজ্জতা চোখে পরার মতো। আগে অপরাধীরা ভয় পেত, আজ তারা নিশ্চিন্ত। ধর্ষক জানে, অপরাধের পর তার পক্ষে দাঁড়ানোর জন্য মব প্রস্তুত। রাষ্ট্র নীরব সম্মতিও দিচ্ছে। সামাজিক সম্মতি পেয়ে গেলে অপরাধ আর অপরাধ হিসেবে গণ্য হয় না।
তাহলে প্রশ্ন আসে– এই তথাকথিত অভ্যুত্থান কাকে মুক্ত করলো?

যদি নারীদের ধর্ষণ আগের চেয়ে বেড়ে যায়, যদি শিশুরা আগের চাইতে বেশি অনিরাপদ হয়ে পড়ে, যদি হেনস্তাকারীকে মহাপুরুষ বানানো হয়, আর রাষ্ট্র নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে – তবে এই মুক্তি কার?

সবচেয়ে দুঃখজনক হলো, এই নারীবিরোধী শক্তির উত্থানের পেছনে ব্যবহার করা হয়েছে এক শ্রেণির নারীকেই। তাদের ব্যবহার করা হয়েছে রাজনৈতিক বৈধতার যন্ত্র হিসেবে। মিছিলে, পোস্টারে, স্লোগানে – নারী ছিল প্রতীক ও সংখ্যা। কিন্তু নিরাপত্তা নির্ধারণে? রাষ্ট্রগঠনে? সিদ্ধান্ত গ্রহণে? সেখান থেকে নারীদের ছুঁড়ে ফেলা হয়েছে। কি নিখুঁত, কি নির্মম এক ম্যানিপুলেশন।

আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে প্রশ্নটা আরও স্পষ্ট –এই তথাকথিত অভ্যুত্থান কি সত্যিই নারীদের এগিয়ে নিয়েছে? নাকি উল্টো আরও পিছিয়ে দিয়েছে কয়েক দশক? ২৪ পরবর্তী নারীরা কেন একাত্তরের পর সবচেয়ে পরাজিত পক্ষ? এটি কোনো দুর্ঘটনা না, এটি একটি রাজনৈতিক ফলাফল। রাষ্ট্র যখন ধর্ষক পালে তখন ধর্ষণ বাড়ে। রাষ্ট্র যখন নীরব থাকে তখন অপরাধীরা কথা বলে। আর ইতিহাস কখনোই নীরবতার দায় এড়িয়ে যেতে দেয় না।

[ফেমিনিস্ট ফ্যাক্টরে প্রকাশিত মুক্তমত লেখকের নিজস্ব বক্তব্য]

Leave a Reply