April 23, 2026
ফিচার ২মুক্তমত

লিখতে লিখতে পড়তে পড়তে…

অদিতি সরকার ।। জীবনকে আমরা যেভাবে দেখতে চাই জীবন অনেক সময় ঠিক সেভাবে আমাদের কাছে ধরা দেয় না। অনেক ঘুরপথ এবড়ো খেবড়ো রাস্তা আমাদের পাড়ি দিতে হয়। সমাজ ব্যবস্থার কানাগলিতে কিছুটা গতানুগতিকতার বাইরের কারো সাথে এঁটে ওঠা হয়না। সব দিক দিয়ে কেউ যেন পথ আগলে ধরে।

আমি কখনো জানতাম না আমার লেখার ক্ষমতা আছে কিনা। আমি যখন প্রথম জীবনে কবিতা লিখেছিলাম, তখন আমি কিশোরী। শ্রাবণ মাসের সেই মেঘলা দুপুরে ডায়েরিটা টেনে নিয়েছিলাম কবিতা লিখব বলে। আজকের আমি তখন নিজেকে নিয়ে এত স্বচ্ছন্দ ছিলাম না। ধীরে ধীরে এই পথে আমার একটু একটু পথ চলা। আমি যখন উচ্চ মাধ্যমিকে পড়ি, তখন আমার সেই আবেগমথিত কাব্য পড়ার মানুষ ছিলেন আমার শিক্ষিকারা। ক্লাসের ফাঁকে তাঁরা আমার কাঁচা হাতের কবিতাগুলি পড়তেন ও উৎসাহ দিতেন। ময়না ম্যাম, রিনি ম্যাম, মনি ম্যাম ধীরে ধীরে আমার বন্ধু হয়ে উঠেছিলেন। আমার জীবনের অবহেলাগুলোর কখনো কখনো সাক্ষী ছিলেন। সহপাঠীদের অবহেলায় যখন স্থির থাকতে পারিনি তখন তাঁরা আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরতেন যেন আমি খানিক স্থির হতে পারি। নারীরাই তো নারীর সমব্যথী হয়।

লিখে কী হয় আমি ঠিক বুঝিয়ে বলতে পারব না। তবে এই যে শব্দ নিয়ে খেলছি, ভাষা, বাক্য বর্ণ নিয়ে মেতে থাকার নেশা – এই নেশা আমাকে অন্য কিছু নিয়ে ভাবার অবসর দেয়নি। কথা বলতে গেলেই বরং আমাকে অনেক বেগ পেতে হয়। কারো কারো কাছে লেখালেখি শুধুই সময় কাটানোর অস্ত্র, কারো কারো কাছে অক্সিজেন নেবার মতই জরুরি। সন্দেহাতীতভাবে আমার ক্ষেত্রে দ্বিতীয়টাই প্রযোজ্য হবে। লিখতে লিখতে অনুভব করেছি মসির চেয়ে তীক্ষ্ণ ধারালো অস্ত্র আর কিছু নেই।

লিখতে শুরু করার পর আমার মনে হল আমি তো চিরকাল লিখতেই চেয়েছি। পথটা বন্ধুর, কোনো সন্দেহ নেই। এই পথে বহু অপরিচিতের মুখ চেনা স্বজন হয়ে ওঠে। আমিও ব্যতিক্রম নই। আমাকে অপার মায়ায় বেঁধে রাখার মানুষ লিখতে এসে পেলাম। অগ্রজ, অনুজ, বন্ধু, সুহৃদ, সকলেই আমার জীবনবৃক্ষে অপরিহার্য।

সম্পর্কের ক্ষেত্রে সম্বোধন কখনো দেয়াল নয়। বরং তা যেন আমার সম্পর্ককে সুমিষ্টতা দান করেছে। এত মায়াও যে আছে তা আগে কোনোদিন অনুধাবন করিনি। যখন থেকে করেছি ঋদ্ধ হয়েছি।

এক সময় আমাকে অনুবাদের নেশায় পেল। কবিতা অনুবাদ দিয়েই শুরু করলাম। অল্প অল্প প্রকাশিত হতে লাগল। অনুবাদে বিপুল উৎসাহ পেতে লাগলাম। আমাকে কাজের সুযোগ করে দেন যারা, আর আমাকে বিশ্বাস করেছেন, তাদের কাছে আমি ঋণী। আমি স্মরণ করছি বন্ধু শাফিনকে, ওয়েব ম্যাগ এর ছায়া থেকে বের হয়ে উপন্যাস অনুবাদের অভিজ্ঞতা ওর সূত্রেই পাওয়া। উপন্যাসটি ইন্দোচীন যুদ্ধের আলোকে লেখা, যার রচয়িতা ভারতের পুণে নিবাসী অধ্যাপক অবিনাশ বিনিওয়ালে। এই সুযোগে আমি তাঁকেও প্রণাম জানাই।

লেখার কথা অনেক হল, এবার খানিক পড়াতে ফিরি। লিখতে গেলে প্রথম শর্তই থাকে পড়া। পড়ার জগৎ তৈরি করাও একটা ক্ষমতা। কত কিছুই না আছে জগতে পড়ার। একটা জীবন বড় ক্ষুদ্র, তুচ্ছ মনে হয় এই বিপুল পঠনের জগতে।

বই পড়ার একটা নেশা আমাকে পেয়ে বসেছিল সেই শৈশব থেকে। বই ছাড়া জীবনে কিছুই ভাবতে পারিনি কোনোদিন। স্কুল ছুটির অলস দুপুরগুলো বইয়ের মাঝে ডুবে যেতেই ভালো লাগত আমার। সবচেয়ে বেশি আমার কাছে উপহার হিসেবে কাম্য বই। এর চেয়ে অমূল্য উপহার আমি ভাবতে পারিনা আজো।

অমর একুশে বইমেলা শুরু হলেই আমি বাবার সাথে চলে যেতাম বই কিনতে। সে সময় আমাদের কাছে বিনোদন বলতে ছিল খানিক জাদুঘর, শিশুপার্ক, চিড়িয়াখানা ও বই মেলা। ব্যাগ ভরে বই নিয়ে ফিরতাম। হুমায়ুন আহমেদের বইতে ব্যাগ ভরা থাকত। ক্লাস ফাইভে যখন পড়ি, তখন উপহার পেয়েছি হোমারের ইলিয়ড, ওডিসি। উপহার দিয়েছিলেন আমার গৃহশিক্ষক মিঠু বাঙালি স্যার। স্যারের নামটা আজো অনুরণিত হয়।

বইয়ের কথা যখন উঠলই, আমাকে বলতেই হবে আমার স্কুল হলিক্রস স্কুলের বিশাল লাইব্রেরির কথা। সপ্তাহের একটি দিন ৪৫ মিনিট বরাদ্দ থাকত বই পড়ার জন্য। সেখানেই আমার হুমায়ুন আহমেদের আপনারে আমি খুঁজিয়া বেড়াই প্রথম পড়া। জীবনে বাবা, মা, মামা, শিক্ষক সবার থেকেই বই উপহার পেয়েছি। যেদিন আমাদের বিদায় অনুষ্ঠান হয়, সেদিন আমি সৈয়দ মুজতবা আলীর পঞ্চতন্ত্র বইটি উপহার পেয়েছিলাম। দিনটি মানসপটে উজ্জ্বল হয়ে আছে।

বই নিয়ে আমি আরো বহুদূর লিখে যেতে পারি। আজকাল মোবাইলে নোটসে লেখার সিস্টেম বের হয়েছে। কিন্তু যার জীবনে ডায়েরি কলমের নিবিড় সংযোগ ঘটেছে তার কি আর কোনো কৃত্রিমতা ভাল লাগে? লেখালেখি করি বলে ডায়েরি উপহারও পেয়েছি অনেক।

শেষ দিকে এসে আরো কিছু কথা বলে যাই। মনোবিজ্ঞান বলে, লিখে মনের ভাব প্রকাশ করলে মানসিক চাপ দুশ্চিন্তা দ্বিধা শংকা কেটে যায়। জীবনে যখনই কোনো নেতিবাচকতার মুখোমুখি হয়েছি, তখনই অজস্র শব্দ এসে মন ও মস্তিস্ক দখল করেছে, আর আমি টেনে নিয়েছি কলম ও ডায়েরি। লেখার চেয়ে বড় কোন স্বস্তিকর উপায় আমি খুঁজে পাইনি। আমি যেন আজীবন লিখে যেতে পারি, ঈশ্বরের কাছে এই কামনা করি।

[ফেমিনিস্ট ফ্যাক্টরে প্রকাশিত মুক্তমত লেখকের নিজস্ব বক্তব্য]

Leave a Reply