March 17, 2026
ফিচার ১কলাম

মেধা কীভাবে যাচাই করে?

নাহিদ আক্তার ।। রোববার সংসদে এমপি শিক্ষামন্ত্রীর কাছে একটি প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। তার বক্তব্য ছিল স্কুলে শিক্ষার্থী ভর্তি লটারির মাধ্যমে না করে মেধার ভিত্তিতে করা উচিত। তার যুক্তি অনুযায়ী, লটারির মাধ্যমে ভর্তি হওয়ার কারণে নাকি বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রকৃত মেধাবী শিক্ষার্থী পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

এই বক্তব্যটি শুনতে প্রথমে অনেকের কাছে যৌক্তিক মনে হতে পারে। কিন্তু বিষয়টি একটু গভীরভাবে ভাবলে দেখা যায়, শিক্ষাব্যবস্থার বাস্তবতা এবং সমাজবিজ্ঞানের মৌলিক কিছু ধারণা বিবেচনা না করলে এমন সিদ্ধান্ত খুব সহজেই ভুল পথে নিয়ে যেতে পারে।

সমাজবিজ্ঞানে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা আছে Meritocracy এবং Cultural Capital

Meritocracy বলতে বোঝায় এমন একটি সমাজব্যবস্থা যেখানে সুযোগ, মর্যাদা বা সাফল্য নির্ধারিত হয় ব্যক্তির মেধা ও কর্মক্ষমতার ভিত্তিতে। তত্ত্বগতভাবে এটি ন্যায়সঙ্গত বলে মনে হলেও বাস্তবে এই ধারণা অনেক সময় সামাজিক বৈষম্যকে আড়াল করে। কারণ সমাজের সব মানুষ একই জায়গা থেকে তাদের যাত্রা শুরু করে না।

এখানেই আসে Cultural Capital বা সাংস্কৃতিক পুঁজির ধারণা। একটি শিশুর পরিবার, সামাজিক পরিবেশ, ভাষাগত দক্ষতা, বই পড়ার সুযোগ, বাড়ির শিক্ষাগত পরিবেশ, প্রযুক্তির ব্যবহার, কোচিং বা অতিরিক্ত শিক্ষার সুযোগ এসবই তার শিক্ষাজীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। ফলে যে শিশু পরীক্ষায় ভালো ফল করছে, তার পেছনে প্রায়ই থাকে দীর্ঘ সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা। অন্যদিকে, যে শিশু একই ফল করতে পারছে না, তার অনেক সময় সেই সুযোগগুলোই ছিল না।

বাংলাদেশের মতো একটি দেশে এই বৈষম্য আরও প্রকট। একটি গ্রামের সীমিত সুযোগের মধ্যে বড় হওয়া একটি শিশুর শিক্ষা-বাস্তবতা এবং শহরের সচ্ছল পরিবারের একটি শিশুর বাস্তবতা এক নয়। একজনের কাছে বই, ইন্টারনেট, কোচিং, শান্ত পড়ার পরিবেশ সবকিছু সহজলভ্য; অন্যজন হয়তো সেই মৌলিক সুযোগগুলোর অনেকটাই পায় না। এই বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে শুধুমাত্র পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে “মেধা” নির্ধারণ করা আসলে একটি জটিল সামাজিক বাস্তবতাকে অত্যন্ত সরল করে দেখার শামিল।

আরও একটি বিষয় এখানে গুরুত্বপূর্ণ শৈশবে মেধা নির্ধারণ করা অত্যন্ত কঠিন। একটা ছোট্ট শিশু বড় হয়ে তার মেধা প্রকাশ করতে পারবে কি পারবে না  নির্ভর করে অনেকগুলি বিষয়ের উপর। শিশুদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও মানসিক বিকাশ একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। অনেক শিশুর সম্ভাবনা সময়ের সঙ্গে ধীরে ধীরে বিকশিত হয়। খুব ছোট বয়সে একটি পরীক্ষার মাধ্যমে তাদের “মেধাবী” বা “অমেধাবী” বলে চিহ্নিত করা শুধু বৈজ্ঞানিকভাবেই দুর্বল নয়, অনেক সময় তা শিশুদের আত্মবিশ্বাস ও মানসিক বিকাশের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

এই কারণেই বিশ্বের অনেক উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক পর্যায়ে কঠোর মেধাভিত্তিক বাছাই করা হয় না। উদাহরণ হিসেবে -এর শিক্ষা ব্যবস্থার কথা প্রায়ই উল্লেখ করা হয়। সেখানে শিক্ষানীতির মূল লক্ষ্য হলো সব শিশুকে সমান মানের শিক্ষা দেওয়া এবং তাদের সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ নিশ্চিত করা। খুব ছোট বয়সে প্রতিযোগিতা বা কঠোর বাছাইয়ের পরিবর্তে সেখানে গুরুত্ব দেওয়া হয় অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা, মানসিক সুস্থতা এবং শেখার আনন্দকে।

শিক্ষার মূল দর্শন হওয়া উচিত সমতা, মানবিকতা এবং অন্তর্ভুক্তি। যদি আমরা খুব ছোট বয়স থেকেই শিশুদের “মেধাবী” এবং “অমেধাবী” এই দুই ভাগে ভাগ করতে শুরু করি, তাহলে শিক্ষা ব্যবস্থা অনিচ্ছাকৃতভাবেই সামাজিক বৈষম্যকে আরও শক্তিশালী করে তোলে। তখন শিক্ষা হয়ে ওঠে সুযোগের সমতা তৈরির একটি মাধ্যম নয়, বরং বিদ্যমান বৈষম্যকে পুনরুৎপাদনের একটি কাঠামো।

একটি ন্যায়ভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থার লক্ষ্য হওয়া উচিত সুযোগের সমতা তৈরি করা, যাতে প্রত্যেক শিশু তার নিজস্ব সামর্থ্য অনুযায়ী বিকশিত হতে পারে। শিক্ষা কখনোই কেবল কিছু নির্বাচিত মানুষের জন্য নয়; শিক্ষা একটি মৌলিক অধিকার, যা সমাজের প্রতিটি শিশুর জন্য সমানভাবে নিশ্চিত করা দরকার।

তাই শিক্ষানীতি নিয়ে আলোচনা করার সময় আমাদের শুধু পরীক্ষার ফল বা তথাকথিত মেধার প্রশ্ন নয়, বরং সমাজের বাস্তব বৈষম্য, শিশুদের সম্ভাবনা এবং শিক্ষার মানবিক উদ্দেশ্য এই সবকিছু একসাথে বিবেচনা করা জরুরি। একটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা কেবল কয়েকজন “সেরা” শিক্ষার্থী তৈরি করার জন্য নয়; বরং এমন একটি সমাজ গড়ে তোলার জন্য, যেখানে প্রত্যেক মানুষ তার সম্ভাবনাকে বিকশিত করার ন্যায্য সুযোগ পায়।

 

[ফেমিনিস্ট ফ্যাক্টরে প্রকাশিত কলাম লেখকের নিজস্ব মতামত]

Leave a Reply