April 24, 2026
কলাম

রাজনৈতিক বাস্তবতায় নারীবাদী আন্দোলনের ভাঙন

নাহিদ আক্তার ।। পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা শুধু পুরুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অনেক নারীও এই মানসিকতাকে ধারণ ও পুনরুৎপাদন করেন। ফলে নারীর সাফল্য তাদের কাছে হুমকি মনে হয়। ক্ষমতার কাঠামোর ভেতরে টিকে থাকার জন্য কেউ কেউ পুরুষতন্ত্রের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেন এবং অন্য নারীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। তাই বলা যায় পুরুষতান্ত্রিক নারী অনেক সময় আরও ক্ষতিকর হয়ে ওঠে কারণ তারা ভেতর থেকেই নারীদের ঐক্য ভেঙে দেয়।

নারীরা কি নারীদের সঙ্গে কম সহযোগিতা করে? এই প্রশ্নটি প্রায়ই ওঠে কিন্তু প্রশ্নটি নিজেই বিভ্রান্তিকর। বাস্তবে নারীরা স্বভাবগতভাবে কম সহযোগী নন। বরং তাদের এমন একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর ভেতরে রাখা হয়েছে যেখানে সহযোগিতার শর্তগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে দুর্বল করা হয়েছে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নারীদের শেখায় সীমিত সুযোগের জন্য একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী হতে। শিক্ষা, পরিবার, কর্মক্ষেত্র এবং রাজনীতি – সব জায়গাতেই নারীদের বলা হয় একজন এগোলে আরেকজনের জায়গা কমে যাবে। এই ভয় থেকেই সন্দেহ ঈর্ষা এবং দূরত্ব তৈরি হয়।

এই বাস্তবতা বাংলাদেশে নারীবাদী আন্দোলনের ভাঙন বোঝার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে সব নারীবাদী ঐক্যবদ্ধ নন কারণ নারীবাদ এখানে একরকম অভিজ্ঞতা বা একক রাজনৈতিক অবস্থান থেকে গড়ে ওঠেনি। শ্রেণি, শহর-গ্রাম, ধর্ম রাজনৈতিক আনুগত্য, এনজিও কাঠামো এবং আন্তর্জাতিক দাতানির্ভরতার ভেতর দিয়ে নারীবাদ নানা খণ্ডে বিভক্ত হয়েছে। অনেক সময় এলিট নারীবাদ প্রান্তিক নারীদের ভাষা ও বাস্তবতা ধারণ করতে পারে না; আবার অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্র ও ক্ষমতাসীন রাজনীতির সঙ্গে আপস নারীবাদী অবস্থানকে দুর্বল করে।

এই ভাঙন সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে ডিজিটাল সহিংসতা ও সাইবার বুলিংয়ের ক্ষেত্রে। অনলাইন মব নারীদের আক্রমণ করলে নারীরা প্রায়ই একা হয়ে পড়েন। কারণ অনলাইন সহিংসতা কেবল মতাদর্শগত নয় এটি ব্যক্তিগত সম্মান নিরাপত্তা ও জীবনের ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত। আইনি সুরক্ষা দুর্বল সামাজিক লজ্জা প্রবল এবং সমন্বিত দ্রুত প্রতিক্রিয়ার কাঠামো অনুপস্থিত। ফলে অনেক নারী চুপ থাকাকেই নিরাপত্তা মনে করেন এবং নারীবাদী গ্রুপগুলোও প্রায়ই একক অবস্থান নিতে ব্যর্থ হয়।

২০২৪ এর পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই সমস্যা আরও গভীর হয়েছে। নারীদের অনলাইনে এবং অফলাইনে হয়রানি করে পুরস্কৃত হচ্ছে ডানপন্থী রাজনীতি, নারীর পরিচয় ও নৈতিকতাকে ব্যবহার করে ভোটব্যাংক তৈরি করছে এবং সহিংস পুরুষতান্ত্রিক আচরণ রাজনৈতিক বৈধতা পাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে নারীরা কেন একসঙ্গে কাজ করতে পারছে না তা নৈতিক ব্যর্থতা নয় বরং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত বিচ্ছিন্নতার ফল।

তবুও প্রশ্ন থেকে যায় নারীরা যদি সবাই একসঙ্গে কাজ করত তাহলে কি জেতা সম্ভব না। উত্তর হলো সম্ভব। কিন্তু সেই ঐক্য কেবল স্লোগানে নয়, কাঠামোয় আনতে হবে। ক্ষমতা ভাগাভাগি করতে হবে, ভিন্নমত ও সমালোচনাকে জায়গা দিতে হবে এবং নেতৃত্বে বৈচিত্র্য আনতে হবে। নারীবাদ তখনই শক্তিশালী হবে যখন তা কেবল শহুরে শিক্ষিত নারীর নয়; শ্রমজীবী, আদিবাসী, সংখ্যালঘু, যৌন ও লিঙ্গ বৈচিত্র্যের নারীদের অভিজ্ঞতাকে সমান গুরুত্ব দেবে।

নারীরা নারীর শত্রু নয়। পুরুষতন্ত্রই নারীদের একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড় করায়। এই সত্য স্বীকার না করলে নারীদের মধ্যে সহযোগিতা কেন দুর্বল তা বোঝা যাবে না। আর যখন নারীরা একে অন্যের সাফল্যকে হুমকি নয় শক্তি হিসেবে দেখতে শিখবে তখনই পুরুষতন্ত্রের ভিত নড়তে শুরু করবে।

[ফেমিনিস্ট ফ্যাক্টরে প্রকাশিত কলাম লেখকের নিজস্ব বক্তব্য]

Leave a Reply